দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মসজিদ-ই-জামে আবদুল্লাহ নাম হলেও লোকে এটিকে চেনে জিনা মসজিদ নামে। কারুকার্যে খচিত মসজিদটির বয়স ১৩৫ বছর। কথিত আছে এক রাতে অসংখ্য জিন মসজিদটি নির্মাণ করেছিল। এমন স্থাপনাকে ঘিরে মানুষের সীমাহীন আগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক। তাই প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই মসজিদ দেখতে।
জিনের মসজিদ বা জিনা মসজিদটি অবস্থিত লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার দেনায়েতপুর গ্রামে।
সরেজমিনে মসজিদটিতে গেলে দর্শনার্থীদের ভিড় চোখে পড়ে। কৌতূহল নিয়ে দর্শনার্থীদের এ সময় মসজিদের চারপাশ ঘুরে দেখতে দেখা যায়। আবার দূর থেকে অনেকে এসেছেন এখানে নামাজ পড়তে। এখানে একসঙ্গে প্রায় এক হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন।
১১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭০ ফুট প্রস্থের এ মসজিদের তিনটি গম্বুজ আর চারটি মিনার রয়েছে। ৫৭ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত হয়েছে মসজিদটি। এর দেওয়ালের প্রস্থ ৮ ফুট। মসজিদটির বেশ কিছু অংশ নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে, কাজ চলছে এখনও। মসজিদের সামনে রয়েছে বিশাল দিঘি। তার পাশে রয়েছে ২৫ ফুট উচ্চতার একটি মিনার।
মসজিদের সামনের দিঘি
কথা হয় ওমর ফারুক রাজু নামে ঘুরতে আসা এক পর্যটকের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে অনেকেই ঘুরতে আসেন। আমি এসেছি রামগঞ্জ থেকে। মূলত এখানে পরিবেশটা ঠাণ্ডা। এসে নামাজ পড়ে বসে থাকলেও ভালো লাগে। জিনেরা এ মসজিদ তৈরি করেছে কি না জানি না। শত বছর আগের ঘটনা তো আর আমরা দেখিনি। তবে ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি এ মসজিদ জিনদের তৈরি।
সায়েদ মোহাম্মদ রাকিব নামে স্থানীয় এক যুবক বলেন, ঘটনার সত্যতা জানি না। তবে মুরুব্বিদের কাছ থেকে শুনেছি, এখানে কোনো মসজিদ ছিল না। এক ভোরে মানুষ এসে দেখেন রাতারাতি এখানে মসজিদ হয়ে গেছে। জিন ছাড়া তো এক রাতে কারও পক্ষে মসজিদ বানানো সম্ভব নয়।
মসজিদের আগের খতিব ছিলেন মাওলানা হেফজুর রহমান। তিনি হজে থাকায় তার ভাই মো. লুৎফুর রহমান খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন। কথা হলে তিনি বলেন, এ মসজিদটি করেছেন মাওলানা আবদুল্লাহ। নিজ উদ্যোগে স্থানীয়দের নিয়ে এ মসজিদটি করেছেন তিনি।
মসজিদে ঢোকার সিঁড়ি
শোনা যায় মাওলানা আবদুল্লাহর কিছু শিষ্য জিন ছিল, তারাই এক রাতে এ মসজিদ করেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জিন আছে এটা সত্য, আমরাও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে অনুভব করেছি, এখানেও করছি। জিনদের মধ্যেও অনেক ভালো জিন আছেন, আলেম আছেন। তারাও দ্বীন শিক্ষা নেন, মসজিদে আসেন নামাজ পড়তে। তবে এ মসজিদটি তারাই করেছে, এ কথার ভিত্তি নেই।
খতিব লুৎফুর রহমান বলেন, তবে মাওলানা আবদুল্লাহ সাহেবের একটা প্রভাব ছিল যে, কোনো জিনে ধরা রোগীর সামনে মাওলানা আবদুল্লাহ সাহেবের নাম নিলে জিন চলে যেতো। অর্থাৎ ওই রোগীকে যদি বলা হতো এখন তাকে মাওলানা আবদুল্লাহ সাহেবের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে জিন তাকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যেতো। জিনেরা উনাকে প্রচণ্ড ভয় পেত।
মিনার
ইতিহাস বলছে-
১৮৮৮ সালে মাওলানা আবদুল্লাহ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ১৮২৮ সালে রায়পুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের এক পর্যায়ে পড়াশুনার জন্য ভারতে চলে যান তিনি। ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসায় ১৭ বছর লেখাপড়া শেষে দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে কিছুদিন অবস্থান করেন। এ সময় দিল্লি শাহি জামে মসজিদের শৈল্পিক কারুকাজ ও নকশা তাকে আকৃষ্ট করে। পরে দেশে ফিরে নিজ এলাকায় ওই মসজিদের মত একটি মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। সবশেষে সেই শাহি জামে মসজিদের নকশা অনুযায়ী ১৮৮৮ সালে মসজিদ-ই-জামে আবদুল্লাহ নির্মাণ করেন।
এটি নির্মাণের জন্য ভারত থেকে লোক আনিয়েছিলেন মাওলানা আবদুল্লাহ। মসজিদের পাশে একটি কওমি মাদরাসা ও মুসাফিরখানাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মসজিদের এক তৃতীয়াংশ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার পর মাওলানা আবদুল্লাহর মৃত্যু হয়। এরপর তার ছেলে মাওলানা মাহমুদ উল্যা অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন। এখন মাদরাসাটি চালু থাকলেও মুসাফিরখানা বন্ধ।
মসজিদের নিচের সুড়ঙ্গে ঢোকার পথ
মসজিদটির অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে এর ২০ ফুট নিচে থাকা তিন কামরার একটি গোপন ইবাদতখানা। শোনা যায় এখানেই ধ্যানে মগ্ন থাকতেন মাওলানা আবদুল্লাহ। মসজিদের নিচের সুড়ঙ্গে এখন বছরের বেশিরভাগ সময় পানিতে পরিপূর্ণ থাকে।
এক সময় গভীর রাতে এ মসজিদ থেকে জিনদের জিকিরের ধ্বনি ভেসে আসলেও এখন আর তা শোনা যায় না। মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় জিনদের আনাগোনা এখন আর নেই। এমনটি মনে করেন স্থানীয় অনেকে।
প্রসঙ্গত, রাজধানীর ১২১ লালবাগ রোডে খান মোহাম্মদ মিরধা মসজিদ, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়া জামে মসজিদ, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার নাগেরপাড়া ইউনিয়নের তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদগুলোও জিনের মসজিদ নামে পরিচিত।
জেডএ