দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

আগামী বছরের এপ্রিল কিংবা মে মাসে ভারতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। টানা দুই দফায় ক্ষমতায় থাকার পর নির্বাচনের প্রায় এক বছর আগে চার মহাদেশ সফর করছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিশ্বের সবচেয়ে গণতন্ত্রের দেশ ভারতে, সাম্প্রতিক সময়ে, বিরূপ পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের। এমনকি কয়েক মাস আগে বিবিসি’র এক ডকুমেন্টরিতে গুজরাটের দাঙ্গায় মোদির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি পার্টি। ঠিক এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জি-২০ সামিট শেষে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, ফ্রান্স ঘুরে সর্বশেষ সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করলেন মোদি।
মোদিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে একজোট হচ্ছে ভারতের বিরোধীরা। আঞ্চলিক বিভ্ন্নি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলে ক্ষমতায় যেতে মরিয়া কংগ্রেস দল। কিন্তু মোদির জনপ্রিয়তা ভাটা পড়েনি। উল্টো জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্বের যে ঝাণ্ডা গেড়েছিলেন তিনি এবং বিজেপি পার্টি, তা আরও মজবুত হয়েছে। তাই তো জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ ক্ষমতা বাতিলের পরও দিব্যি নিজেদের মতো করেই সবকিছু করে যাচ্ছে বিজেপি। এমনকি সম্প্রতি দেশটির নতুন পার্লামেন্ট উদ্বোধনের পর কংগ্রেসসহ বেশ কয়েকটি পার্টি ওই অনুষ্ঠান বর্জন করে। এছাড়া সেখানে যে অখণ্ড ভারতের মানচিত্র আঁকা হয়েছে, তা নিয়েও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে।
অবস্থা যাই হোক না কেন, পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন মোদি। ২০০২ সালে তার সরকারের সময় গুজরাটে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, তা থেকে বেশ ভালোভাবেই শিক্ষা নিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তাই যে আমেরিকার দরজা একসময় তার জন্য রুদ্ধ ছিল, তা এখন উন্মুক্ত। শুধু কী তাই, মোদিকে যেভাবে আপ্যায়ন ও অর্ভ্যথনা জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসন, তাতে এটা অনেকটাই নিশ্চিত, ভারত এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। চীনকে মোকাবিলায় ভারতের বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ যে অভিযোগ রয়েছে, তা অনেকটা অগ্রাহ্য করে গেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে অস্ট্রেলিয়ায় যান মোদি। চীনকে মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন কোয়াড জোটে অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ভারত। আর এক যৌথ জনসভায় রাখঢাক না করেই সেই কথা বলেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। তিনি মোদিকে বস বলেও সম্বোধন করেন। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন আলবানিজ। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বলয় বৃদ্ধি এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সামরিক উচ্চাকাক্ষ্ঙায় ভীত ভারত। সেই ভয় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া মনেও গেঁথে আছে। তাই চীনের তথাকথিত আগ্রাসনের ব্যাপারে একজোট হতে প্রতিরক্ষা খাতেও সম্পর্ক জোরদার করতে চায় অস্ট্রেলিয়া ও ভারত।
মুখে এবং কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি নিজে থেকেও ব্যাকআপ প্ল্যান হাতে নিয়েছে নয়াদিল্লি। এরই অংশ হিসেবে দুই যুগের বেশি সময় পর প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মিশর সফর করেন মোদি। ডলারকে মোকাবিলা এবং নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার লক্ষ্যে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে মিলে ব্রিকস গড়ে তোলে ভারত। কিন্তু ব্রিকসেও ক্রমেই চীনের প্রভাব বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন সদস্যরাষ্ট্র যুক্ত করার ব্যাপারে বেইজিংয়ের আগ্রহ বেশি। তাতে অনেকটাই কোণঠাসা ভারত ভালোভাবেই উপলব্ধি জোটে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বন্ধু বাড়ানোর বিকল্প নেই। উত্তর আফ্রিকার দেশ মিশর, নয়াদিল্লির সেই ছকেরই অংশ। ব্রিকসে নিজের প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ফয়দা নিতেও মোদির মিশর সফর বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
আফ্রিকা মহাদেশে ফ্রান্সের উপনিবেশ বেশি ছিল। ওই অঞ্চলে দেশটির প্রভাব এখনও প্রবল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারতের সঙ্গে মতের অমিল এবং মানবাধিকার ইস্যুতে নয়াদিল্লির ওপর নাখোশ হলেও চীনের ভয়ে মোদির হাত ধরতে চান পশ্চিমা নেতারা। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চান মোদি। ফ্রান্সের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ভারত। তাই প্যারিসের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক আগে থেকেই মজবুত। আর মোদির ফ্রান্স সফরে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর একজন উপদেষ্টা বলেছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ভারতের আমাদের একটি পিলার। এমন সার্টিফিকেটের পর ইউরোপে মোদির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করার খুব একটা সুযোগ নেই।
তবে নির্বাচনের তরী পার হতে শুধু শত্রু মোকাবিলাই যে যথেষ্ট নয়, তা খুব ভালো করেই উপলব্ধি করেছেন মোদি। তাই শনিবার যখন সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন মোদি, সেখানে বাণিজ্যের প্রসার এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এই দেশে ভারতের শ্রমবাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের আলোচনা করেছেন তিনি। গেল দুই মাস ধরে মোদির এই ম্যারাথন বিশ্ব সফরে রাজনৈতিক অভিলাষ থাকলেও বাণিজ্য একটা বিষয় ছিল। সেই হিসাবে তার এই আমিরাত সফর সবচেয়ে সফল। কেননা বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার পর আমিরাতও ভারতীয় মুদ্রায় লেনদেনে রাজি হয়েছে। তাতে রুপির প্রভাব যে আস্তে আস্তে বাড়ছে, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।