দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতের ওড়িশা রাজ্যের উপকূলীয় গ্রাম উদায়কানি। এক সময় গ্রামটির প্রতিটি বাড়ির দেয়ালে শোভা পেত বিয়ের বিভিন্ন নকশা। বিয়েতে ব্যবহার করা শঙ্খ ও সানাইয়ের (বাদ্যযন্ত্র) চিত্রও থাকতো দেয়ালে। নকশাগুলো নব দম্পতির জন্য শুভ বলে বিবেচিত হতো। তবে, সময়ের ব্যবধানে সেই নকশা আজ বিবর্ণ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গ্রামটিতে কোনো নতুন বধূ আসেনি।
উদায়কানির এক পাশে সীমাহীন সাগর। আরেক পাশে ফসলি খেত। তানদাহার গ্রামের পার্শ্ববর্তী উদায়কানিতে ২৫ বছর আগে একটি সুপার সাইক্লোন আঘাত হানে। ভারত মহাসাগরের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সাইক্লোনে বিধ্বস্ত হয় গ্রামটি। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনে সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ত পানিতে গ্রামটির ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়।
তানদাহার গ্রামের বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী ভাইদেহি কার্দি বলেন, ‘মাটি লবণাক্ত হলে আমাদের ফসল কুঁচকে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধীরে ধীরে আমাদের মাটি আরও লবণাক্ত হয়ে গেল এবং আমাদের জীবন শুকিয়ে গেল। বর্তমানে আমাদের ছেলেদের বিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সবাই মনে করে আমাদের গ্রাম আর নিরাপদ নয়।’
ভারতের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ভারতের উপকূলরেখা রয়েছে চার হাজার ৭০০ মাইল বা সাত হাজার ৫০০ কিলোমিটার। ভারতীয় উপমহাদেশ বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ ঘূর্ণিঝড়ের সংস্পর্শে এসেছে। বেশিরভাগই ঘূর্ণিঝড়ই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ও পূর্ব উপকূলে আঘাত হেনেছে। ভারতের পশ্চিম উপকূলে থাকা আরব সাগরের তুলনায় বঙ্গোপসাগরে চারগুণ বেশি ঘূর্ণিঝড় রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে গত জুন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে ৯টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্ট হয়েছে।
ওড়িশা রাজ্যের উপকূলরেখা রয়েছে ২৮ মাইল। তবে, এর ২৮ শতাংশ সামুদ্রিক ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে ভাঙনের শিকার। গত মার্চে রাজ্যটির পার্লামেন্টে জানানো হয়, তাদের ১৬টি গ্রাম সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ২৪৭ গ্রাম।
উদায়কানির বাসিন্দা ৭৪ বছর বয়সী বুধেসওয়ার কার্দি বলেন, ‘১৯৯৯ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর ক্ষত ঠিক হতে অনেক সময় লেগেছে। ঘূর্ণিঝড়টিতে আমাদের ঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বেশিরভাগ ফসলি জমি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অনেক জমিকে গ্রাস করেছিল সমুদ্র। জীবন রক্ষার্থে আমরা স্থানান্তরিত হয়েছিলাম। জমি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেও আমরা খুব একটা সফলতা পায়নি। এখন মনে হচ্ছে, সমুদ্র প্রতি বছরই লোকালয়ের দিকে আসছে।’
৫৮ বছর বয়সী অর্জুন প্রধান নিজের ছেলে অভিজিতের জন্য সবশেষ পাঁচ বছর ধরে পাত্রী খুঁজছেন। চার বছর আগে তিনি শহরে চলে যাওয়ার জন্য ছেলেকে পরামর্শ দেয়। অর্জুন প্রধান বলেন, ‘একটা সময় আমাদের গ্রামের যুবকদের ২০ থেকে ২১ বছর বয়সে বিয়ে হতো। কিন্তু, এখন বাস্তবতা পুরোই ভিন্ন। বয়স ৩০ হলেও যুবকদের জন্য পাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে স্থানান্তরিত হতে বলেছিলাম। শুধুমাত্র কাজের জন্য এটি বলিনি। সে যাতে পাত্রী পায় তার জন্য বলেছিলাম। আমাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী, পাত্রী বাছাই থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত অনেক বিধিনিষেধ মানতে হয়। কিন্তু, আমি আমার ছেলের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে চায় না। আমি চাই সে ভালোভাবে থাকুক।’
শুধুমাত্র বিয়ে নয়, আরও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে উপকূলীয় গ্রামগুলোর বাসিন্দারা। সেখানকার জমিতে লবাণক্ততা বাড়ছে। পানের অযোগ্য হয়ে পড়ছে পানি। এই কারণে গ্রামগুলোতে কেউ আসতে চায় না। এমনকি, অনেকের নিকট আত্মীয়রাও আসে না। তানদাহারের ৫০ বছর বয়সী কাঞ্চন সোয়ান বলেন, ‘আমাদের এখানে যেই আসুক না কেন তারা রাতে থাকে না। আমাদের খাবার পানি তাদের স্যুট করে না। এ ছাড়া এখানকার পানি দিয়ে মেহমানরা গোসল করতে পারে না। গোসল করলেই তাদের শরীর চুলকায়।’
তানদাহার থেকে ১০ মাইল দূরে গিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করে গ্রামটির বাসিন্দারা। পানির বিনিময়ে তাদের শস্য দিতে হয়।
লবণাক্ততা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান অন্তরায়। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবেশবিদরা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ফাও’র তথ্যমতে, বিশ্বের ৮৩ কোটি ৩০ লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ত। বছরে এর পরিমাণ বাড়ছে ১০ শতাংশ করে।
ভাইদেহি কার্দি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘লবণাক্ত বাড়ায় আমাদের স্বাভাবিক জীবন তো আর স্বাভাবিক থাকছে না। কেন আমরা গ্রামে পড়ে থাকবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আমরা কৃষিকাজে জড়িত। তবে, এখন আমাদের জমিতে ফলন হচ্ছে না। সন্তানদের বাইরে পাঠানো ছাড়া আমাদের কাছে কোনো পথ খোলা নেই।’
উপকূলীয় গ্রামগুলোতে এখন আর যুবকদের দেখা যায় না। বয়স্ক নারী-পুরুষে পূর্ণ গ্রামগুলো। কারণ, ভালো ভবিষ্যতের আশায় যুবকেরা গ্রাম ছাড়ছে। তবে, গ্রাম ছাড়লেও চাকরি বা জীবনসঙ্গী খুব সহজে তাদের জীবনে আসছে না।
হায়দ্রাবাদে স্থানান্তর হওয়া অভিজিত প্রধান বলেন, ‘এখানে আমি যে চাকরিটা করি তা স্থায়ী নয়। এখানে আমি হোটেল বয় হিসেবে কাজ করি। সবশেষ দুই বছরে আমাকে তিন জায়গায় চাকরি করতে হয়েছে। যখনই আমার চাকরি চলে যায় তখনই আমি গ্রামে ফিরি। বলা তো যায় না অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা জেনেও কোনো মেয়ে বিয়েতে রাজি হলে।’
৩২ বছর বয়সী উদায়কানির এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ পর্যন্ত মেয়েপক্ষ তাকে চারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেন, ‘যারাই আমার বাড়িতে এসেছিল সবাই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিল। আমি বর্তমানে চেন্নাই থাকি। আমার বাবা-মা সেখানকার কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে বলেছে। তবে, আমি ভয় পাই। কারণ, মেয়েপক্ষ আমার গ্রামে এলে তারা আবার প্রত্যাখ্যান করতে পারে।’
তানদাহার গ্রামের ২৭ বছর বয়সী সত্যয়া কার্দিকে একই পরামর্শ দিয়েছে তারা বাবা ও দাদা। নিজের কর্মস্থলে কোনো নারীকে বিয়ে করতে বলেছেন তারা। সত্যয়া কার্দি বলেন, ‘অন্য সংস্কৃতির মেয়েকে বিয়ে করলে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হবে। আর স্বল্প আয় দিয়ে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।’
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
এম