দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইউজেনিক্স একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। ল্যাটিন শব্দ ‘ইউজেনেস’ থেকে এসেছে ইউজেনিক্স শব্দটি। ইউজেনিক্সের মূল বিষয় হল, কোনো জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলো থেকে যাবতীয় অনভিপ্রেত জিন দূর করা। মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকে তথাকথিত নানা রোগ, প্রতিবন্ধকতা, মানসিক সমস্যা, খারাপ বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি দূর করা। তবে, এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রয়োগে সন্তান জন্মদানে অক্ষম বা নির্বীজন করা হয় গোটা বিশ্বের হাজার হাজার নারী-পুরুষ।
১৯৩৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত সময়ে ৬৩ হাজার মানুষের ওপর ইউজেনিক্স তত্ত্বের প্রয়োগ করেছিল সুইডেন, যার বেশিরভাগ ছিল নারী। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম দেখে মানুষ ঈর্ষা করবে এমনটির আশায় ছিল তারা।
সুইডেন সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নাৎসি বৈশিষ্ট্যের এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল সুইডিশ সমাজকে ‘নিকৃষ্ট’ জাতিগত ধরন থেকে মুক্ত করা। তাদের বিশ্বাস ছিল, তারা একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র তা সবাইকে বুঝানো। ওই সময়ে যেসব সুইডিশের ওপর ইউজেনিক্স তত্ত্বের প্রয়োগ করা হয়েছিল তারা সবাই ছিল গরীব ও অশিক্ষিত। এ ছাড়া নর্ডিক অঞ্চলের রক্ত নেই এমন মানুষের ওপরও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটির প্রয়োগ করা হয়।
৭১ বছর বয়সী চলচ্চিত্র নির্মাতা কেজেল সানস্টেড বলেন, ‘তৎকালীন সরকার মূলত একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক লোকের থেকে রেহাই পেতে চেয়েছিল। তার হলো, দুর্বলেরা।’
কেজেল সানস্টেডের এক খালা ও চার মামার জোর করে ইউজেনিক্স তত্ত্বের প্রয়োগ করা হয়েছিল। বিষয়টি জানতে পেরে আশ্চর্য হন তিনি। এটি ছিল তার জন্য বড় রকমের একটি ধাক্কা।
সানস্টেড তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদুলা এজেন্সিকে বলেন, ‘বিষয়টি অতি গোপনীয় ছিল। তাই কেউ এই বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পায়নি। এ ছাড়া সুইডেন সরকার এমনটি করে লজ্জিত ছিল। তাই সব কিছু গোপনই রয়েছে।’
ইউজেনিক্স তত্ত্ব প্রয়োগের ৪০ বছর পর দেশটির পাঠ্যপুস্তকে এর ইতিহাসের কোনো কিছু তুলে ধরা হয়নি। এমনকি, পূর্বে থাকলেও তা মুছে দেওয়া হয়েছে।
সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নজরে সানস্টেডের খালা ও মামারা প্রগতিশীল দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল না। এ জন্য তাদের কঠিন মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। তাদেরও ওপর প্রয়োগ করা হয় ইউজেনিক্স তত্ত্ব। এর জেরে তারা সন্তান জন্মদান করতে পারেনি।
সানস্টেড বলেন, ‘আমার আত্মীয়দের মূল অপরাধ তারা গরীব ছিল।’
সুইডিশ এই চলচ্চিত্র নির্মাতার মা সুইডেনের রাজধানী থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে, সানস্টেডের খালা মাজ-ব্রিট নিজেকে বাঁচাতে পারেনি। বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়েছে তাকে।
মাজ-ব্রিটের মা অর্থাৎ, সানস্টেডের নানী যখন মারা যায় তখন তার সন্তানদের একটি আইকিউ টেস্ট নেওয়ার কথা বলে নেওয়া হয়। অবশ্য তাদের নেওয়া হয়েছিল সোশ্যাল সার্ভিস সেন্টারে। সেখানে বিভিন্ন নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছিল তারা, এর মধ্যে ছিল ধর্ষণও।
তাদেরকে সন্তান জন্মদানে অক্ষম করা হয় খুব কম বয়সেই।
সানস্টেড বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের কাছে বুদ্ধিমত্তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আমার স্বজনেরা আইকিউ টেস্টে ফেল করার পর তাদের গর্ধবের খেতাব দেওয়া হয়।’
নির্যাতনের বিরুদ্ধে মাজ-ব্রিট আওয়াজ তুলেছিলেন। তবে, তাকে পাগলাগারদে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগীদের প্রায়শ সোশ্যাল সার্ভিস সেন্টারে নেওয়া হতো ও নিজেদের অজান্তেই তাদের সন্তান জন্মদানে অক্ষম করা হতো।
৭২ বছর বয়সী মারিয়া নর্ডিনের শৈশবকালে মানসিক সমস্যা ছিল। ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা চশমা ছাড়া দেখতে পারতেন না তিনি। এর জেরে তার ওপরও ইউজেনিক্স তত্ত্বের প্রয়োগ করা হয়। ফলস্বরূপ বন্ধ্যা হয়ে যান তিনি। সুইডেনের দৈনিক দাগনেস নায়াটারকে মারিয়া নর্ডিন বলেন, ‘আমার শৈশবকালের অক্ষমতার জন্য আমি লজ্জিত নয়। অন্যদেরও এমনটা হওয়া উচিত।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নর্ডিনের বয়স ছিল ১৭ বছর। অস্বাভাবিকতার জন্য ওই সময় জোর করে তাকে একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়। সেখানেই বন্ধ্যা করানো নিয়ে তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
নর্ডিন বলেন, ‘আমাকে স্কুলের বাইরে যেতে হবে, এ জন্যই আমি এতে স্বাক্ষর করেছিলাম। আমাকে বোলনাস হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তারা আমাকে বন্ধ্যা করে দেয়। তখন একজন চিকিৎসক আমাকে বলেছিলেন, তুমি অতটা মেধাবী নয়। তোমার সন্তান হওয়া বোকামি।’
সানস্টেডের দাদা তার সন্তানদের বন্ধ্যা করা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে, এতে তিনি সাফল্য পাননি। সানস্টেড বলেন, ‘মুক্তির জন্য, নির্যাতিতদের একটি নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল যা বন্ধ্যাকরণের প্রক্রিয়া অনুমোদন করে।’
১৯৬০ এর দশকে রাষ্ট্রপরিচালিত বন্ধ্যাকরণ নিয়ে সুইডেনে আন্দোলনের শুরু হয়। বিরোধী রাজনীতিবিদদের সমালোচনার মুখে পড়ে তৎকালীন সরকার। অবশেষে ১৯৭৬ সালে পদ্ধতিটি বাতিল করে সুইডেন সরকার।
১৯৯০ দশকে এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় সুইডেনের পার্লামেন্টে। কমিটির তথ্যমতে, জোর করে নির্বীজন করা হয়েছিল তিন হাজার মানুষকে। তবে, এই সংখ্যাটি মূল সংখ্যার থেকে কয়েক গুণ কম।
বন্ধ্যাকরণ নিয়ে লজ্জিত সুইডেন সরকারও। ১৯৯৭ সালে দেশটির সামাজিক বিষয়ক মন্ত্রী মার্গট ওয়ালস্ট্রম বলেছিলেন, ‘যা ঘটেছে তা বর্বরতা ছাড়া কিছুই নয়।’
কাউন্সিল অফ ইউরোপের সংসদীয় পরিষদ তার ২০১১ সালের রিপোর্টে নিশ্চিত করেছে যে সুইডেনে নির্বীজনের শিকার হয়েছে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
এম