দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই।
সোমবার (১ জুন) বিকেলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবরণ, মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্র পরিচালনা ও দল সংগঠনের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী ছিলেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তার পিতা মৌলভী আজহার আলী এবং মাতা ফাতেমা বেগম। ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক সম্পন্ন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ও অশ্বিনী কুমার হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। চার ছাত্র সংগঠনকে একত্র করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার ভিত্তিতে ১১ দফা প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। এর ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।
১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৭০ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। ওই বছর জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন মাত্র ২৭ বছর বয়সে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর চার আঞ্চলিক অধিনায়কের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র গঠন ও পুনর্গঠনের কাজেও সক্রিয় ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত গণপরিষদের অন্যতম সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। পরে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধুর বিশেষ সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হিসেবে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, আলজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সফর করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ৩৩ মাস কারাবন্দি ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও দল সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয় লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংসদ সদস্য পদ হারান তিনি।
দীর্ঘ ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, সংগ্রাম, কারাবরণ, মুক্তিযুদ্ধ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকা তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো।
এমএস/