দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জাতীয় নাগরিক পার্টির এনসিপির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি গণবিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও আগের দুর্নীতিগ্রস্ত ও বেইনসাফি বৈষম্যমূলক কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছে। রোববার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে খুনি হাসিনা গুম, হত্যা, বিনা বিচারে কারাবন্দি, হামলা, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা চালাতে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করেছে। এতে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রলীগসহ সব অঙ্গসংগঠন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের মতো সব বাহিনী ও সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানই এসব অপকর্মে ব্যবহৃত হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লবের পর এই কাঠামোর অনেক কিছু ভেঙে পড়েছে। নেতৃত্বে থাকা কিছু ব্যক্তি পালিয়েছে, কেউ কেউ বিচারের মুখে পড়েছে এবং অনেককে ধরার চেষ্টা চলছে। বহু সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং বিচারক এখনো কর্মরত থাকলেও জুডিশিয়ারি, সিভিল সার্ভিস ও পুলিশ বিভাগের শীর্ষ নেতৃত্ব ভেঙে পড়েছে। তবে ডিফেন্স সার্ভিস এখনো অটুট রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, হাজার হাজার খুনি ও লুটেরা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছে, সেখান থেকে নিরাপদে বিদেশে চলে গেছে, কিছু জেনারেল কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়েছে এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বৈরী রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজনের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে তাদের জব্দ করার চেষ্টা সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, খুনি হাসিনাকে উৎখাতের পর অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতা দিয়ে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হলেও সুপিরিয়র কমান্ডের অনাগ্রহে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলেও অপরাধী শনাক্ত, অস্ত্র উদ্ধার ও গ্রেপ্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। গুম বিষয়ক কমিশন ১ হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করলেও নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা তথ্য ও আলামত নষ্ট করে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, তাদের লড়াই হবে ‘নিপীড়নের ব্যবস্থা’ ও ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সমূলে উৎপাটন করা।
ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প লোপাটের অর্থ উদ্ধার ও বিচার করা হবে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে করা শ্বেতপত্র অনুযায়ী হাসিনা ও তার মদদপুষ্ট ব্যবসায়ী ও আমলারা এই অর্থ সরিয়ে নিয়েছে, যা অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এই অর্থ উদ্ধারের কথা বললেও অবহেলা ও অজ্ঞতার কারণে কোনো সাফল্য আসেনি এবং সুবিধাভোগী কিছু শীর্ষ আমলা ও বিশেষজ্ঞের অন্তর্ঘাতে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, জনগণ যদি এনসিপিকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং জড়িত কাউকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। খুনি হাসিনার দোসর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের সুবিধাভোগী আমলা ও আত্মীয়স্বজনকে আইনের আওতায় আনা হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিদেশে শনাক্ত হওয়া অর্থ কর বিভাগের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে জরিমানাসহ কর আরোপ করতে হবে এবং দেশে থাকা তাদের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। একই সঙ্গে চিহ্নিত লুটপাটকারীদের গণশত্রু ঘোষণা করে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে একটি ‘পাবলিক ট্রাস্ট’-এর অধীনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। আন্তর্জাতিক মানের পেশাজীবীদের দিয়ে স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় এই সংস্থা পরিচালনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, লক্ষ্য হবে ঘুষ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের সংস্কৃতি বন্ধ করে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
শেখ হাসিনার আমলে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, দেশের কূটনীতি কার্যত ভারতকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল এবং দিল্লি থেকেই ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, গণতন্ত্রকে অকেজো করা ও গণবিরোধী শাসন কায়েম করা হয়েছে ভারতের ইচ্ছা অনুযায়ী বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিএসএফ শত শত বাংলাদেশিকে হত্যা করলেও তৎকালীন সরকার চুপ ছিল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সচিব ও বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা ভারতের এই আচরণের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেন, এমনকি শত্রুভাবাপন্ন ও যুদ্ধরত দেশের সীমান্তেও এভাবে বেসামরিক নাগরিক হত্যা করার নজির নেই।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ স্লোগান থাকলেও বাস্তবে তখনকার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ভারতের নির্দেশ পালন করা। পাকিস্তানের প্রতি বৈরী আচরণ করা হয়েছে এবং বাংলাদেশকে ভারতের পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি জানান, এনসিপি ক্ষমতায় গেলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়া হবে, সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা হবে এবং আসিয়ানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা চলবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা হবে। প্রবাসীদের সেবা বাড়াতে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন ও কূটনীতিকের সংখ্যা বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
সশস্ত্র বাহিনী প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, হাসিনার আমলে বাহিনীকে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে নয়, দলীয় স্বার্থে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে বাহিনী দুর্বল হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান কাঠামোতে প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর। সরকার গঠন করতে পারলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনী গড়া হবে এবং ১৮ ঊর্ধ্ব সব সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করা হবে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি, কারণ ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এনসিপি সরকার গঠন করলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট ভাঙা হবে এবং অবৈধ মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বৈরাচারী শাসনে পুলিশ একটি দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ গত ১৫ বছরে যারা হত্যা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও দুর্নীতিতে জড়িত ছিল, তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হবে।
বিচারব্যবস্থা নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে বিচার চাওয়া এখন দীর্ঘ ও হতাশাজনক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। মামলা গ্রহণে অনীহা, তদন্তে বিলম্ব, আদালতে দীর্ঘসূত্রতা ও উচ্চ ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার দূরে সরে গেছে।
এমএস/