দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

হাঁসের মাংস, তাজা রুটি আর নানা ধরনের পিঠার ঘ্রাণে ঢাকার নীলা মার্কেট যেন বাংলাদেশের খাদ্য ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তবে প্রতিটি খাবারের পেছনে রয়েছে শুধু স্বাদ ও ঐতিহ্যের গল্প নয়; রয়েছে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রন্ধনশৈলীকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার গল্পও।
নীলা মার্কেটে কয়েক দফা মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে বিক্রেতাদের সাক্ষাৎকার, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং ক্রেতা উপস্থিতি ও বিক্রির ধরন নথিভুক্ত করেছি। এসব তথ্য থেকে দেখা যায়, বাজারটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হলেও তা এখনো অনেকটাই অনালোচিত।
নীলা মার্কেটে বর্তমানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি সক্রিয় খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। প্রতিদিন আনুমানিক ২ হাজার থেকে ৩ হাজার মানুষ এখানে আসেন। বিক্রেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দোকানে দৈনিক গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ জন ক্রেতা খাবার গ্রহণ করেন। এতে দৈনিক বিক্রি হয় প্রায় ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা। মাঝারি আকারের কিছু রেস্তোরাঁয় দৈনিক বিক্রি ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।
এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে—ঐতিহ্যবাহী খাবার শুধু আমাদের সংস্কৃতির সম্পদ নয়, এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধি এবং নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তিরও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
এই সংখ্যাগুলোর পেছনের গল্পগুলো আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ইকো বেগম মাত্র ২০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর দৈনিক আয় প্রায় ৫ হাজার টাকা। এই আয় তাঁর পরিবারকে আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে, খালেদা তাঁর চাচার রেস্তোরাঁয় কাজ করতে গিয়ে ব্যবসার বিভিন্ন দিক শিখেছেন। কীভাবে ক্রেতার চাহিদা বুঝতে হয়, বিক্রির হিসাব রাখতে হয় এবং খাবারের অপচয় কমাতে হয়—এসব অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে নিজের একটি রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও তৈরি হয়েছে।
তাঁদের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, নারীরা যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান, তখন তাঁরা শুধু আয় করেন না; নিজেদের সক্ষমতা বাড়ান, নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জন করেন এবং পরিবারের ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করেন।
তবে এসব অর্জনের পেছনে রয়েছে নানা প্রতিকূলতা। সমাজের প্রচলিত কিছু ধারণা এখনো নারীদের ঘর ও পরিবারের নির্দিষ্ট ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। ব্যবসার মালিক হওয়া, অর্থ পরিচালনা করা কিংবা একটি প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এসব সামাজিক বাধা নারীর প্রতিভাকে সীমিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে তাদের পূর্ণ অবদানকেও বাধাগ্রস্ত করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঠামোগত নানা সমস্যা। অধিকাংশ বিক্রেতার রান্নার দক্ষতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত। কিন্তু অনেকেরই খাদ্য নিরাপত্তা, হিসাবরক্ষণ, ক্রেতাসেবা, ডিজিটাল বিপণন কিংবা আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য এসব দক্ষতা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য।
এই উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক ঝুঁকিগুলোর একটি হলো দোকান ভাড়ার অনিশ্চয়তা। সাক্ষাৎকারে কয়েকজন বিক্রেতা জানিয়েছেন, লিজ নবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। জমির মালিকের সঙ্গে বিরোধ কিংবা বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের কারণে দোকান হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে। বছরের পর বছর শ্রম ও বিনিয়োগের পরও একটি ব্যবসা হঠাৎ হারিয়ে যেতে পারে। স্থায়ীভাবে জায়গা ব্যবহারের নিশ্চয়তা না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণও নিরুৎসাহিত হয়।
তারপরও সম্ভাবনা বিশাল। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রতি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। খাঁটি স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে আগ্রহী মানুষের কাছে নীলা মার্কেটের মতো বাজারগুলো গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণে পরিণত হতে পারে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ খাদ্য ঐতিহ্যও বিশ্বের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। খাবার সরবরাহের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপণন এবং মোবাইল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা বাজারের ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে আরও বেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন।
এর পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবায় নারীদের প্রবেশাধিকার বাড়ানো জরুরি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু ঋণ পাওয়ার সুযোগ নয়; এটি অর্থনৈতিক নাগরিকত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা। নারীরা যখন নিরাপদে সঞ্চয় করতে পারেন, ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে পারেন, দায়িত্বশীল অর্থায়ন গ্রহণ করতে পারেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারেন, তখন তাঁরা দৈনন্দিন টিকে থাকার সংগ্রাম থেকে টেকসই উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে যান।
প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও এ ক্ষেত্রে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভারতের স্বনিয়োজিত নারী সমিতি বা সেফা সমবায়, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, আর্থিক সেবা এবং সম্মিলিত সংগঠনের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের সফল ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তোলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন উদ্যোগও দেখিয়েছে, দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল শিক্ষাকে যুক্ত করা গেলে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশের প্রয়োজন এসব মডেল হুবহু অনুসরণ করা নয়; বরং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সফল উপাদানগুলো গ্রহণ করা।
নীলা মার্কেটের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যৌথ রান্নাঘর চালু করা হলে বিক্রেতারা সরঞ্জাম ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারবেন, পরিচালন ব্যয় কমবে এবং খাদ্য নিরাপত্তার মানও বাড়ানো সম্ভব হবে। আকর্ষণীয় ব্র্যান্ডিং ও উন্নত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে পিঠা, রুটি ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খাবার দেশের বৃহত্তর বাজার এমনকি বিদেশেও পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করাও কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। এতে বিক্রেতাদের দৈনন্দিন ব্যবসা ব্যাহত না করে ডিজিটাল দক্ষতা, ক্রেতাসেবা, হিসাবরক্ষণ, খাদ্য নিরাপত্তা ও ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে।
সরকারি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরামর্শ, কারিগরি সহায়তা, বাজারসংযোগ এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
পর্যটন কর্তৃপক্ষেরও নীলা মার্কেটকে সাংস্কৃতিক পর্যটনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ এখানে একজন পর্যটক শুধু বাংলাদেশের খাবারের স্বাদই পাবেন না; একই সঙ্গে দেখতে পাবেন নারীদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পও।
নীতিগত সংস্কারও জরুরি। স্বচ্ছ ভাড়ার চুক্তি ও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নারী বিক্রেতাদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁদের জীবিকা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের মতামত গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাশ্রয়ী প্রশিক্ষণ ও আর্থিক পণ্য স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।
ঐতিহ্যবাহী খাবার শুধু খাবার নয়। এটি ইতিহাস, পরিচয় ও স্মৃতি। প্রতিটি সংরক্ষিত রেসিপি, প্রতিটি তৈরি করা পিঠা কিংবা প্রতিটি হাতে বানানো রুটি একদিকে যেমন প্রজন্মের পর প্রজন্মের জ্ঞান বহন করে, অন্যদিকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দেয়।
এই উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা তাই একই সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করার উদ্যোগ। নীলা মার্কেটকে বিচ্ছিন্ন একটি সাফল্যের গল্প হিসেবে রেখে দেওয়া উচিত নয়। এটি হতে পারে এমন একটি জাতীয় মডেল, যেখানে ঐতিহ্যবাহী খাবার সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে এবং নারীদের নিজেদের জীবন ও দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ দেবে।
আমার মাঠপর্যায়ের গবেষণা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—নীলা মার্কেটে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ ও সক্ষমতা ইতোমধ্যে রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। আমি যেসব নারীর সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা দয়া বা অনুদান চান না। তাঁরা চান ন্যায্য সুযোগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং অর্থায়নের সুযোগ।
বাংলাদেশ যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সমৃদ্ধ খাদ্য ঐতিহ্য সংরক্ষণে সত্যিই গুরুত্ব দেয়, তাহলে নীলা মার্কেটের মতো উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে হবে।
এমএস/