দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন উৎসব সাকরাইন বা পৌষসংক্রান্তি। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে চলছে সাকরাইন উৎসবের জোর প্রস্তুতি। সাকরাইনে রঙিন ঘুড়িতে আকাশ ঢাকার অপেক্ষায় রয়েছে পুরান ঢাকা। প্রতিবার এই দিনকে ঘিরে আগে থেকেই অলিতে গলিতে উৎসবের আলাদা আমেজ বিরাজ করলেও, এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সাকরাইনকে কেন্দ্র করে নেই আগের মতো উদ্দীপনা। আর এতে প্রভাব পড়েছে বেচাকেনাতে।
আগামী বুধবার (১৪ জানুয়ারি) উদযাপিত হতে যাচ্ছে এই সাকরাইন উৎসব। ঘুড়ি উড়ানো উৎসব নামে পরিচিত এই উৎসবের দিন পুরো সময় পুরান ঢাকার আকাশে উড়বে রঙিন ঘুড়ি। এরপর সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী এলাকায় আকাশ আলোকিত হবে আতশবাজি ও ফানুশে।
আজ মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায়, সূত্রাপুর, নবাবপুর, ধূপখোলা, শ্যামবাজার, শাঁখারি বাজার, তাঁতীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, সদরঘাট, গেন্ডারিয়া, লালবাগ ও চকবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এ উৎসব উপলক্ষে তেমন আমেজ লক্ষ্য করা যায়নি। তবে দোকানে দোকানে আগের মতোই নানা রঙের ঘুড়ি, নাটাই, সুতা বেচাকেনা দেখা গেছে। তবে এসব দোকানে ভিড় কম। অন্যান্য বার উৎসবের আগের দিন সঙ্গে সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রস্তুতি, বক্স, সামিয়ানা ও বাঁশ দিয়ে ছাদ সাজানোর ব্যস্ততাও লক্ষ্য করা গেলেও এবার সে দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়েনি।
ঘুড়ির দোকানগুলোতে চোখদার, রকদার, গরুদার, মাছলেঞ্জা, ফিতালেঞ্জা, চানতারা, বাক্স ঘুড়িসহ নানা নামের ঘুড়ি বিক্রি হচ্ছে। পুরান ঢাকার ঘুড়ি বিক্রির অন্যতম কেন্দ্র শাখারি বাজার। এখানে চশমাদার, কাউটাদার, পঙ্খিরাজ, প্রজাপতি, ঈগল, চিল, বাদুর, লাভ ঘুড়ি, টেক্কা, মালাদার ও বিদেশি নকশার ঘুড়ি। সাধারণ ঘুড়ির দাম ৫ থেকে ২৫ টাকা, আর বিশেষ নকশার ঘুড়ির দাম ১০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।

জমে উঠেছে নাটাই ও সুতার বাজারও। কাঠের নাটাই, লোহার নাটাই, চাবাডী নাটাই বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১০০০ টাকায়। ড্রাগন সুতা, ভুত সুতা, বিলাই সুতা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। এছাড়া আতশবাজির মধ্যে রয়েছে পাঁচ শট, বারো শট কদম ফুল, তারা শট, রকেট ও নানা নামের ফানুস। তবে পুলিশের নজর এড়াতে অনেক দোকানি এসব সামগ্রী লুকিয়ে বিক্রি করছেন।
ঘুড়ি কিনতে আসা শাখারী বাজারের বাসিন্দা দশম শ্রেণীর শ্রেণির শিক্ষার্থী বাপ্পি বলেন, ‘এই সময়টার জন্য আমরা পুরো এক বছর অপেক্ষা করি। ঈদের মতোই আনন্দ লাগে। অনেকগুলো ঘুড়ি কিনেছি। সাকরাইনের দিন খুব মজা করব।’

পোস্তগোলা থেকে ঘুড়ি কিনতে আসা সাইম আহমেদ বলেন, ‘আমার ছেলে ঘুড়ি কেনার বায়না ধরেছে। একসময় আমরাও অনেক ঘুড়ি উড়িয়েছি। এখন ওদের সময়। সন্তানকে আনন্দ দিতেই মূলত ঘুড়ি কিনতে আসা।’
পুরান ঢাকার বাসিন্দা শ্যাম নারায়ন বলেন, ‘সাকরাইন ঘিরে তাদের এলাকায় ছোট পরিসরে পারিবারিক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। ঘুড়ি উড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের জন্য নানা খেলাধুলার ব্যবস্থাও থাকে।’
একই এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘উচ্চ শব্দের সাউন্ড সিস্টেম ও ঝুঁকিপূর্ণ আগুনের খেলায় নিয়ন্ত্রণ দরকার। পরিবার নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব করতে চাই।’
এদিকে আগের মতো বেচাকেনা নেই বলছেন ব্যবসায়ীরা। পূর্বপুরুষদের এই ব্যবসায়ে ভাটা পড়েছে। একইসঙ্গে উৎসবের আমেজও তুলনামূলক কমেছে, বলছেন দোকানিরা। তবে আজকে উৎসবের আগের দিন থাকায় বেচাকেনা বাড়বে বলে মনে করেন তারা।
শাঁখারি বাজারের পবিত্র ভাণ্ডার-এর দোকানি দিলীপ নাগ বলেন, ‘বেচাকেনা মোটামুটি, আগের মতো হয় না। পাইকারি ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক ভালো।’
অন্যদিকে লিখন দেবরায় বলেন, ‘প্রতিবছর সাকরাইন উপলক্ষে বাজারে লাখ লাখ টাকার ঘুড়ি ও ঘুড়ির উপকরণ বিক্রি হয়। কিন্তু এবার শুরু থেকেই বেচাকেনায় মন্দা দেখা যাচ্ছে। আবার এখন সাকারইনের সেই আমেজও কম।’
আরেক ঘুড়ি বিক্রেতা লোকনাথ সরকার বলেন, ‘আমার বাবা আগে সাকরাইন এলেই ঘুড়ি বিক্রি করতেন। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমিও এখন ঘুড়ি বিক্রি করছি। বেচাকেনা মোটামুটি হলেও শেষ সময় পর্যন্ত আশাবাদী।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাকরাইন মূলত পারিবারিক উৎসব। সবাই পরিবারের সঙ্গে পিঠাপুলি আর ঘুড়ি উড়ে দিনটি উদযাপন করে। ডিজে পার্টি, উচ্চস্বরে গান বাজানো মূলত সাকরাইন সংস্কৃতির অংশ নয়। একে অন্যের বাসায় দাওয়াত দেওয়া, এটাই এই উৎসবের মাহাত্ম্য বহন করে। বর্তমানে এসব কমে এসেছে, সেই সঙ্গে হারিয়েছে সাকরাইন উৎসবের জৌলুস। সাকরাইন উৎসবে ভর করেছে অপসংস্কৃতি।
উল্লেখ্য, মুঘল আমলে ১৭৪০ সালের দিকে নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের সময় পুরান ঢাকায় সাকরাইনের সূচনা হয়। কালের পরিক্রমায় এটি পুরান ঢাকাবাসীর অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশেই এই উৎসব পালিত হয়।
/অ