দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বগুড়াসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে আমন ও রবি শস্যের ভরা মৌসুমে দেখা দিয়েছে সারের সংকট। এ কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা। ডিলারের কাছে সার মিলছে না, আবার খোলা বাজারে মিললেও দাম কয়েকগুণ বেশি—এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন চাষিরা।
কৃষকেরা জানান, ডিলারদের গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকলেও তারা কৃষকদের সরবরাহ না দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এরপর সেই সার খোলা বাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এর পেছনে ডিলারদের সিন্ডিকেট এবং কৃষি অফিসের গাফিলতি দায়ী।
তবে কৃষি অফিস, বিএডিসি ও বিসিআইসি দাবি করছে, চলতি আমন ও রবি মৌসুমে পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে। কোনো সংকট হবে না। তাদের ভাষ্য, অনেক কৃষক আগেভাগে বোরো মৌসুমের জন্য সার মজুদ করায় এ ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষিজমি পরিদর্শনে গিয়ে কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়া বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের কোনো সংকট নেই।’
তবে উত্তরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকেরা এ বক্তব্যকে ‘হাস্যকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের দাবি, ‘যখন মাঠে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের সংকটে ভুগছে কৃষকেরা, তখন সচিবের এ বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।’
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইউরিয়া সারের চাহিদা ৯৩ হাজার ৯৩৪ মেট্রিক টন, টিএসপি ২৫ হাজার ৮৭ টন, ডিএপি ৪৫ হাজার ৮৪৬ টন এবং এমওপি ৩৬ হাজার ৪১৮ টন।
এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়া দরকার ৭ হাজার ৮৯৩ টন, টিএসপি ১ হাজার ৪০০ টন, ডিএপি ২ হাজার ৫৩ টন এবং এমওপি ২ হাজার ৬৭৪ টন। বর্তমানে মজুদ আছে ৪ হাজার ৩৫৮ টন সার।
সরকারি নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে— ইউরিয়া ও টিএসপি: প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ১,৩৫০ টাকা, এমওপি: প্রতি বস্তা ১,০০০ টাকা এবং ডিএপি: প্রতি বস্তা ১,০৫০ টাকা।
কৃষি বিভাগের দাবি, মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং চলছে। কোনো অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের মতে, মৌসুম শুরুর আগেই সার সংকটের গুজব ছড়ানো হয়। এরপর গুদামে মজুদ রাখা হয় এবং কালোবাজারে পাচার করে খুচরা দোকানে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। কৃষকেরা বলেন, সরকারি দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারের কোনো মিল নেই।
বগুড়া বিএডিসির তথ্যমতে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে টিএসপি ১,০৯২ টন, এমওপি ২,৬৭৪ টন, ডিএপি ২,০৫৩ টন বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বর্তমানে গোডাউনে টিএসপি ১৩,১৬০ টন, এমওপি ২০,০৪৬ টন ও ডিএপি ২০,৯০৭ টনসহ মোট ৫৪,১৮৪ টন সার মজুদ রয়েছে।
বগুড়া বিসিআইসি বাফার ইনচার্জ মো. মোস্তফা কামাল জানান, জেলায় ৭,৮৯৩ মেট্রিক টন ইউরিয়া বরাদ্দ পাওয়া গেছে। জেলায় ১৬৩ জন ডিলার আছেন। তাদের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার সারা দেশে প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন সার কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘বীজতলা থেকে রোপণের কয়েকদিনের মাথায় নন-ইউরিয়া সার দরকার হয়। কিন্তু কোথাও টিএসপি, ডিএপি, এমওপি পাওয়া যাচ্ছে না। সামান্য ইউরিয়া সংগ্রহ করেছি অনেক কষ্টে, তাও বেশি দামে।’ তার আশঙ্কা, এ অবস্থা চললে রবি মৌসুমে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
বগুড়া সদর উপজেলার কৃষক আল আমিন জানান, ‘ডিলারের কাছে কার্ড দেখালে বিঘা প্রতি মাত্র ৬ কেজি সার দিচ্ছেন। আমার ছয় বিঘা জমির জন্য দরকার ১৮০ কেজি, কিন্তু পেয়েছি মাত্র ৩৬ কেজি। বাজারে গেলেও মিলছে না।’
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার সার ব্যবসায়ী মেসার্স মাসুম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মতিউর রহমান দাবি করেন, তারা সরকার নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করছেন। তার মতে, এ অঞ্চলে ধান ও পাটের চেয়ে আম, পেয়ারা ও মালটার বাগানেই বেশি সার ব্যবহার হয় এবং সরবরাহ যথেষ্ট।
কৃষকেরা বলছেন, সার সংকট চলতে থাকলে রোপা আমন দুর্বল হবে, আগাম সবজি চাষও ব্যাহত হবে। ফলে রবি মৌসুমে উৎপাদন কমে গিয়ে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এমএস/