দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

একসময় এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অবাধে বিচরণ করত বিশাল দেহী প্রাণীটি। বিশাল শরীর, শক্ত চামড়া আর নাকের ওপর শিং সব মিলিয়ে প্রাণীজগতের অন্যতম পরিচিত প্রাণী গণ্ডার। কিন্তু মানুষের লোভ, অবৈধ শিকার এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার কারণে আজ গণ্ডারের কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্তির অত্যন্ত ঝুঁকিতে।
শিং-ই এর বড় শত্রু। কারণ গণ্ডারের শিংয়ের কারণেই এটি মানুষের শিকারে পরিণত হয়েছে। তাই তো প্রাণীটির সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বজুড়ে তুলে ধরতেই প্রতিবছর ২২ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব গণ্ডার দিবস।
গণ্ডার দিবস শুধু একটি প্রাণীকে স্মরণ করার দিন নয়। এটি বন্যপ্রাণী পাচার, অবৈধ শিকার এবং বনভূমি ধ্বংসের মতো সমস্যাগুলো নিয়ে সচেতনতা তৈরিরও একটি উপলক্ষ। বিশেষ করে গণ্ডারের শিংকে ঘিরে অবৈধ বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে এ প্রাণীর অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে আছে।
বর্তমানে পৃথিবীতে গণ্ডারের পাঁচটি প্রজাতি রয়েছে সাদা গণ্ডার, কালো গণ্ডার, বৃহৎ একশৃঙ্গ গণ্ডার, জাভান গণ্ডার এবং সুমাত্রান গণ্ডার। আফ্রিকার সাদা ও কালো গণ্ডারের পাশাপাশি এশিয়ার বৃহৎ একশৃঙ্গ, জাভান ও সুমাত্রান গণ্ডারের সংরক্ষণ নিয়েও কাজ চলছে। সব প্রজাতির অবস্থা অবশ্য এক নয়। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সাদা গণ্ডারের সংখ্যা আনুমানিক ১৫ হাজার ৭৫২ এবং কালো গণ্ডারের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৭৮৮। বৃহৎ একশৃঙ্গ গণ্ডারের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৭৫। বিপরীতে জাভান গণ্ডার রয়েছে মাত্র প্রায় ৫০টি এবং সুমাত্রান গণ্ডার ৩৪ থেকে ৪৭টির মতো। এই সংখ্যাগুলোই বোঝায়, কয়েকটি প্রজাতির ক্ষেত্রে প্রতিটি গণ্ডারের জীবন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
গণ্ডারের শিং আসলে হাড় নয়। এটি মূলত কেরাটিন দিয়ে তৈরি মানুষের চুল ও নখেও যে ধরনের প্রোটিন রয়েছে। তবু বিভিন্ন দেশে গণ্ডারের শিংকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও অবৈধ বাণিজ্য রয়েছে। এর ফলেই শিকারিদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে গণ্ডার। অবৈধ শিকারের কারণে আফ্রিকায় বহু বছর ধরে গণ্ডারের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমেছে। ২০২৩ সালে আফ্রিকার দেশগুলোতে মোট ৫৮৬টি গণ্ডার শিকারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছিল বলে আইইউসিএন জানিয়েছে। তবে একই সময়ে আফ্রিকার কালো ও সাদা গণ্ডারের সম্মিলিত সংখ্যা ২৩ হাজার ৮৮৫-এ পৌঁছেছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় কিছু ইতিবাচক ফলও দেখা যাচ্ছে।
জাভান ও সুমাত্রান গণ্ডারের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। জাভান গণ্ডার এখন মূলত ইন্দোনেশিয়ার একটি এলাকায় টিকে আছে। অন্যদিকে সুমাত্রান গণ্ডারের সংখ্যা এত কম যে তাদের প্রজনন ও নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে সংরক্ষণে সাফল্যের উদাহরণও রয়েছে। ভারতের কাজিরাঙাসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃহৎ একশৃঙ্গ গণ্ডার সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের উদ্যোগের ফলে এ প্রজাতির সংখ্যা বেড়েছে। ফলে উপযুক্ত আবাসস্থল, কঠোর নজরদারি এবং অবৈধ শিকার বন্ধ করা গেলে গণ্ডারের ভবিষ্যৎ বদলানো সম্ভব এমন আশাও তৈরি হয়েছে।
গণ্ডারকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়। তাদের টিকে থাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন, তৃণভূমি, জলাভূমি এবং সেই বাস্তুতন্ত্রের অসংখ্য অন্য প্রাণীর অস্তিত্বও। তাই গণ্ডার সংরক্ষণ প্রকৃতপক্ষে জীববৈচিত্র্য রক্ষার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
বিশ্ব গণ্ডার দিবস তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোনো প্রাণীকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর পর বাঁচানোর চেয়ে তার আবাসস্থল ও নিরাপত্তা আগে থেকেই নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি। গণ্ডারের শিং যেন আর তার মৃত্যুর কারণ না হয়, সেই দায়িত্ব শুধু বনরক্ষী বা সংরক্ষণকর্মীদের নয়; অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা থেকে শুরু করে প্রকৃতি রক্ষার প্রতিটি উদ্যোগেই সাধারণ মানুষের ভূমিকা রয়েছে।
কে