দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

আজ দোসরা এপ্রিল, বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। প্রতিবছরের মতো আজকেও নীল বাতির উজ্জ্বলতায় চারপাশ ছেয়ে যাবে, অটিজম নিয়ে সচেতনতার নানা বুলি আমরা শুনব। কিন্তু একজন মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই উৎসবের আবহে একটি উদ্বেগের বিষয় আমাকে ভাবিয়ে তুলছে—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নীরবে বন্ধ হয়ে যাওয়া অসংখ্য ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র’। আজ যখন আমরা দিবসটি উদযাপন করছি, তখন একটি নির্মম সত্য মেনে নিতেই হবে — একটি কেন্দ্র বন্ধ হওয়া মানে একঝাঁক বিশেষ শিশুর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ রুদ্ধ হওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৪ সালের শুরু পর্যন্ত দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে পরিচালিত অন্তত ৩০টির বেশি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার খবর গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ‘চাইল্ড হেলথ অ্যাওয়ারনেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট’-এর দ্বিতীয় পর্যায়ের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং আউটসোর্সিং জনবলের চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় বর্তমানে ঢাকার বাইরে অন্তত ১৫টি কেন্দ্রে কোনো স্থায়ী থেরাপিস্ট নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে এই সংকট এক সংকটাপন্ন মাত্রা ধারণ করেছে। যদিও এই অব্যবস্থাপনার বীজ আগের সরকারের আমলেই বোনা হয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসা অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়েও এই কেন্দ্রগুলো সচল না হওয়া জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রশ্ন তুলছেন—যেই সরকার মানবিক মর্যাদা ও অধিকারের কথা বলেছে, তাদের সময়ে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকা পড়ে থাকবে? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মনিটরিং ডাটা অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অটিজম রেফারেল কেসগুলোর ফলোআপ প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা একটি বড় ধরণের প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
মানসিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি বড় ধরণের কাঠামোগত ত্রুটি। একটি বিশেষ শিশুর জন্য স্পিচ থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এবং সাইকোলজিস্টের সমন্বিত সেবা অপরিহার্য। যখন এই সরকারি কেন্দ্রগুলো অকার্যকর হয়ে যায়, তখন নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে অপচিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁকের দিকে ধাবিত হয়। ড. ইউনূসের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’ মডেলের সঙ্গে এই ‘সেবা বঞ্চিত হওয়ার’ বিষয়টি চরমভাবে সাংঘর্ষিক।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি বা ‘হেলথ ইকোনমিকস’-এর বিচারেও এই সিদ্ধান্তগুলো আত্মঘাতী। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেট’ ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাদের বিশেষ সিরিজে দেখিয়েছে, শৈশবে সঠিক থেরাপি বা ‘আর্লি ইন্টারভেনশন’ পাওয়া একটি শিশু ভবিষ্যতে কর্মক্ষম হওয়ার সম্ভাবনা ৬০-৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বিপরীতক্রমে, সেবা বঞ্চিত শিশুর পেছনে রাষ্ট্র ও পরিবারকে জীবনভর যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়, তা প্রাথমিক থেরাপির খরচের চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি। বর্তমানে বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিটি থেরাপি সেশনের খরচ গড়ে ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত, যা বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। গত দুই বছরে বেসরকারি খাতে এই ব্যয় আরও প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ বেড়েছে।
এই সংকট উত্তরণে আমাদের কেবল দিবসভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতা করলে চলবে না; প্রয়োজন একটি টেকসই রোডম্যাপ। প্রথমত, শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোকে কোনো সাময়িক ‘প্রকল্প’ হিসেবে না রেখে সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থায়ী রাজস্ব বাজেটের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারকে থেরাপি সেবার ওপর ভর্তুকি প্রদান এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের মাধ্যমে বীমা সেবার আওতায় এই চিকিৎসাকে নিয়ে আসতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে অন্তত একজন করে দক্ষ থেরাপিস্ট ও কাউন্সিলর নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অটিজম কোনো রোগ নয়, এটি জীবনের একটি ভিন্ন বৈচিত্র্য। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে এই কেন্দ্রগুলো পূর্ণ শক্তিতে চালু করা হোক। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিটি কেন্দ্রের তালা খুলে সেখানে সেবার আলো ফেরানোই হোক এবারের অটিজম দিবসের প্রধান অঙ্গীকার। আজকের এই নীল আলোর উৎসবে আমরা যেন আমাদের বিশেষ শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যেতে না দিই।
লেখক: ড. ইমদাদুল হক তালুকদার
মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ