দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সাধারণ নির্বাচন নয়। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতির ইতিহাসে এমন এক দিন, যেদিন বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেবে- সে কি নিজের আত্মমর্যাদা, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎকে সম্মান করবে, নাকি আবার একটি বিভ্রান্তিকর পথে পা বাড়াবে।
দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পতনের পর, ভয় ও নীরবতার দীর্ঘ রাত পেরিয়ে, আজ জনগণের সামনে সত্যিকারের একটি বিকল্প পথ উন্মুক্ত হয়েছে। এই সন্ধিক্ষণে আমরা একটি গভীর দায়িত্ববোধ থেকে জাতির সামনে স্পষ্টভাবে কিছু কথা বলতে চাই। এই বক্তব্য কোনো দলীয় আবেগ থেকে নয়; এটি এসেছে রাষ্ট্র, ইতিহাস ও জাতির আত্মমর্যাদার প্রশ্ন থেকে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-ই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, যারা বাস্তবসম্মতভাবে গণতন্ত্র, ইসলামি মূল্যবোধ এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম। অপরদিকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী এবং বিদেশি মওদুদীর হাতে গড়ে ওঠা জামায়াতের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ন্যস্ত করা- জাতির জন্য নিরাপদ তো নয়ই, বরং তা জাতীয় আত্মসম্মানের পরিপন্থী। একজন বিদেশি চিন্তাবিদ মওদুদির তত্ত্বে গড়া দলকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখাটা আমাদের জন্য কোনোভাবেই গৌরবের বিষয় হতে পারে না।
ইসলামের নামে রাজনীতি বনাম ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতি: একটি মৌলিক পার্থক্য:
বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ- এ সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ইসলাম এ দেশের মানুষের হৃদয়ে, পরিবারে, সামাজিক আচরণে এবং নৈতিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু ইসলামের প্রতি ভালোবাসা আর ইসলামকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার বানানো- এই দুই বিষয় এক নয়।
ইসলাম আমাদের শেখায় ন্যায়, ইনসাফ, আমানতদারি, মানবিকতা ও সহনশীলতা। এই শিক্ষা আলোকেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দর্শন গড়ে তুলেছিলেন। সংবিধানে বিসমিল্লাহসহ আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের মূলনীতি তিনিই সন্নিবিষ্ট করেিেছলেন। আমাদের ইতিহাস-বিশেষ করে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-আমাদের সতর্ক করে দিয়েছে, যখনই ধর্মকে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে বসানো হয়েছে, তখনই ধর্ম নিজেই কলুষিত হয়েছে, সমাজ বিভক্ত হয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ভেঙে পড়েছে। পাকিস্তানের পতন তারই প্রমাণ।
জামায়াতের রাজনীতি একটি কল্পিত ও একমাত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার দিকে ধাবিত, যেখানে ভিন্নমত, ভিন্ন ব্যাখ্যা, এমনকি ভিন্ন ইসলামি চিন্তারও জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে- যেখানে মুসলমানদের মধ্যেই নানা মত, মাজহাব ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রয়েছে-এই ধরনের রাজনীতি ঐক্য গড়ে তোলে না, বরং বিভাজনকে উসকে দেয়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র বাস্তবতা এবং জামায়াতের সীমাবদ্ধতা:
বাংলাদেশ কোনো পরীক্ষাগার নয়। এটি একটি ৫৫ বছরের অভিজ্ঞ রাষ্ট্র, যার একটি সংবিধান, প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল ধর্মীয় আবেগ দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য দরকার অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক বোধ।
এই চারটি ক্ষেত্রেই জামায়াত দুর্বল। তারা কখনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেনি। আধুনিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক কূটনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন ও বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-এসব বিষয়ে তাদের কোনো পরীক্ষিত অভিজ্ঞতা নেই।
অপরদিকে বিএনপি চারবার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে, অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করেছে, গ্রাম-শহরের যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে একটি সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে।
ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষায় বিএনপির ঐতিহাসিক ভূমিকা:
সমাজে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ভ্রান্ত ধারণা ছড়াানো হয়েছে-ইসলাম রক্ষার একমাত্র দাবিদার জামায়াত। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিএনপি কখনো ইসলামকে দলীয় শ্লোগানে পরিণত করেনি। কিন্তু ইসলামি মূল্যবোধকে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে সম্মান করেছে। মসজিদ-মাদরাসা, আলেম সমাজ, ধর্মীয় স্বাধীনতা-এই সবকিছুর সুরক্ষা বিএনপির শাসনামলেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
বিএনপি বিশ্বাস করে মধ্যপন্থায়। আল-কুরআনের সূরা বাকারা (২:১৪৩)-এ আল্লাহ নিজেই মুসলমানদের “উম্মাতান ওয়াসাতান”- এক মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সেই শিক্ষা থেকেই বিএনপির দর্শন:
ইসলাম থাকবে মানুষের হৃদয়ে, রাষ্ট্র চলবে মধ্যপন্থায়, ইনসাফ ও সংসদে প্রণীত আইনের মাধ্যমে।
এই পথেই বাংলার মুসলমান যুগে যুগে রাজনীতি করেছে। এই পথেই বিএনপি দেশ পরিচালনা করেছে। এমনকি বিএনপির চেয়ারপার্সন স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- ক্ষমতায় গেলে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক ছাতার আওতায় আনা হবে। এটি কোনো লোক দেখানো প্রতিশ্রুতি নয়; এটি ইসলামি মর্যাদার প্রতি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রচিন্তার প্রকাশ।
জামায়াত বনাম বিএনপি: তরুণদের ভবিষ্যৎ প্রশ্ন-
আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ সমাজ। তারা চায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, এবং বিশ্বে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা। তাদের সামনে ধর্ম বনাম আধুনিকতা- এই কৃত্রিম দ্বন্দ্ব তুলে ধরলে তারা বিভ্রান্ত হবে, পিছিয়ে পড়বে।
বিএনপি ২০২৩ সালেই তরুণদের সামনে একটি সুস্পষ্ট ভবিষ্যৎ রূপরেখা দিয়েছে-৩১ দফা কর্মসূচি। শিক্ষা সংস্কার, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন-সবই সেখানে বাস্তবভিত্তিকভাবে উপস্থাপিত। জামায়াতের রাজনৈতিক বয়ান সেখানে অস্পষ্ট, আবেগনির্ভর এবং অতীতমুখী।
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত-
এই নির্বাচন কোনো দলকে পুরস্কৃত করার নির্বাচন নয়। এটি একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার নির্বাচন:-
বাংলাদেশ কার হাতে নিরাপদ থাকবে?
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই- ইসলাম রক্ষার নামে জামায়াতকে ক্ষমতায় আনতে হবে-এই ধারণা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই ভুল। বায়তুল মোকাররম মসজিদেও মুহতারাম খতিব ইতিমধ্যেই বলেছেন- নামের মধ্যে ইসলাম থাকলেই ইসলামি দল হয় না। গণতন্ত্র, ইসলামি মূল্যবোধ ও আধুনিক রাষ্ট্র-এই তিনটির ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা একমাত্র বিএনপির আছে।
জামায়াতের দ্বিচারিতা:-
ইতিহাস সাক্ষী- জাতির প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে জামায়াত জাতীয় স্বার্থের পাশে দাঁড়ায়নি। ১৯৪০-এর দশকে তারা পাকিস্তানকে সমর্থন করেনি, পরে ১৯৭১ সালেও স্বাধীনতার প্রশ্নে বিতর্কিত অবস্থান নিয়েছে। ১৯৯১ সালে বিএনপির সঙ্গে সংসদে গিয়ে পরবর্তীতে মুনাফেকি করে আওয়ামি লীগের সাথে গিয়ে তাদের হাতে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে কথিত এক এগারোর সময় জাতির সংকটে তারা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। এরপর আওয়ামি লীগের তাড়া খেয়ে আবার বিএনপির ছাতার নীচে আশ্রয় নিয়েছে। বিপদ কেটে গেলে আবার বিএনপিকে ছোবল মেরেছে।
বিবেকের ভোট:
আমরা জনগণের কাছে কোনো আবেগী আহ্বান জানাচ্ছি না। আমরা জানি, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ-কিন্তু তারা বিবেকবানও। তারা জানে- ইসলাম টিকে থাকবে মানুষের হৃদয়ে, আর রাষ্ট্র টিকে থাকবে সুশাসনের উপর।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাই আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন রাখতে হবে-
কে দেশ চালাতে পারবে?
কে রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবে?
কে ইসলামকে ক্ষমতার হাতিয়ার না বানিয়ে তার মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে?
আমাদের বিবেচনায়, সেই দায়িত্ব বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কেই দেওয়া উচিত। দেশ আপনার, দেশের ভবিষৎ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বও আপনার।
লিখেছেন: আসিফ আরমানি ও শামসুল আলম লিটন