দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ এক শোক বিহ্বল ও বেদনা-বিধুর দিন। জাতি হারাল তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে। দেশবাসী শোকে অসহায় ও কাতর। গণতন্ত্রের জন্য যে মহান ব্যক্তিটি নিজের ঘর-সংসার, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সন্তানের মায়া ত্যাগ করে দেশের ভাগ্যাহত মানুষদেরকে স্বজন ভেবে স্বদেশের মাটি আঁকড়িয়ে বেঁচে ছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সারাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ শোকে স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। মহাকাশ থেকে একটি ধ্রুবতারা যেন ঝরে পড়ল। দেশ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল। মানুষ আজ দিশেহারা। সবার চোখ অশ্রুসিক্ত। দিনমজুর, রিক্সাওয়ালা, পথচারী থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণ আপনজন হারানোর বেদনায় মর্মাহত। অন্তর্ভুক্তি সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুস শোক বার্তায় তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং ৩১ ডিসেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন। জাতিসংঘ, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, পাকিস্তান ও ভারতসহ পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্র শোক বার্তা পাঠিয়েছেন। ৮০ বছরের বর্ণাঢ্য ও গৌরবময় জীবনের ৪৫ বছরই অতিবাহিত করেছেন রাজনীতিতে। গণতান্ত্রিক বিশ্বে একজন অনন্য রাজনীতিবিদ হিসেবে সবার মন জয় করেছিলেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে। বর্তমানে যে সময়টাতে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন, দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, দেশের জনসাধারণের জন্য, আরো কিছু দিন বেঁচে থাকার প্রয়োজন ছিল বলে সর্বমহলে শ্রুত হয়। তাহলে জাতি ঘোর-অমানিশার অন্ধকার থেকে মুক্তি পেত। তবে তার মৃত্যুতে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। জাতি পূরণ করবে তার রেখে যাওয়া স্বপ্ন। পালন করবে তার দিকনির্দেশনা, যা হবে তাদের পথের পাথেয়।
সারা জীবন তিনি নিজের ও পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা না করে দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য অকুতোভয় সৈনিকের মতো বিরামহীন কাজ করে গেছেন। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সরকারে নির্যাতন, ২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন আমলে হামলা-মামলা, নির্যাতন, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন কালে অযাচিত অত্যাচার, দ্রবন্ধী করে রাখা ছোট ছেলে আরাফাত রহমানের মৃত্যু, তারেক রহমানের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, সর্বোপরি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার কর্তৃক জিয়া পরিবারের উপর লৌহ-মর্ষক নির্যাতন জাতির ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে আছে। যা জাতি কখনো ভুলতে পারবেনা। তার কঠিন-ইস্পাত অনমনীয় মনোভাব দেশের স্বার্থে কোন কিছুর বিনিময় না করে আপসহীন থেকে যে কষ্ট ও বেদনা নিজের উপর বহন করেছেন, তা জাতি সব সময় মনে রাখবে। তার উপাখ্যান ইতিহাসের পাতায় অমর ও অক্ষয় হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন দেশ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সর্বদা আপসহীন। আগামী একশত বছর ধরে তার মত নেতৃত্ব তৈরি হবে কি’না, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মই মূল্যায়ন করবে। তিনি ছিলেন নিষ্ঠা ও সততার প্রতীক। তার অসুস্থতা ও মৃত্যুতে জাতি এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। তার অন্তর্ধ্যানে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কখনো পূরণ হবার নয়। তিনি ছিলেন ঐক্যের প্রতীক, ন্যায়পরায়ণ মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ একজন সফল ব্যক্তি। এজন্য তার মৃত্যুতে মানুষ খাওয়া-দাওয়া, ঘর-সংসার ফেলে এভার কেয়ার হাসপাতালে ছুটে এসেছে। কান্নাকাটি করেছে আল্লাহর কাছে, দোয়া চেয়েছে তার রুহের মাগফেরাতের জন্য। ক-জন মানুষ এমন ভাগ্যবান বা ভাগ্যবতী হতে পারে। আল্লাহ তাকে সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে সম্মানিত করেছেন, যা ইতিহাসের পাতায় চির অম্লান হয়ে থাকবে। এমন একদিন আসবে যখন, তার কর্মময় ও বর্ণময় জীবন, তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা এবং তার শাসন আমল নিয়ে তার সন্তানেরা গবেষণা করবে। তিনি ছিলেন জীবন্ত ইতিহাস, মরণেও ইতিহাস। গৃহবধূ থেকে দেশের তিনবারের সকল প্রধানমন্ত্রী। দেশের প্রথম এবং পৃথিবীতে দ্বিতীয় মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ছিলেন অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের আইকন ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তার চলাফেরা, আচার-আচরণ, বাচনভঙ্গি এবং সুশাসক জনবান্ধব উদার মন-মানসিকতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আদর্শিক বিষয়বস্তু। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক ও অসম্ভব ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যা তাকে মহীয়সী ও মহীয়ান করে অসীম মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তাইতো তার মৃত্যুতে জাতিসংঘ, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও ভারতসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ শোক বিহ্বল মহাপ্রয়াণ দিন। এই ডিসেম্বরে রণাঙ্গনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে রেখে নিজেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে অন্তরীণ থেকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। সেই ডিসেম্বরে মহান বিজয় দিবসের মাসের ৩০ তারিখে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে কোটি কোটি মানুষকে চোখের পানিতে ভাসিয়ে আমাদেরকে এতিম করে ভোর ছয়টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
৩১ ডিসেম্বর সর্বকালের সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও গণতন্ত্রের মানুষ কন্যা তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী তার স্বামীর পাশে শায়িত হবেন। শেষ হবে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অবসান। জাতি কখনো যদি পথ হারায়, বন্নি পোকার মত লক্ষ কোটি জনতা এখানে আসবে আবার নতুন করে গণতন্ত্রের জন্য শপথ নিতে। দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করার জন্য এই মহান ব্যক্তিত্ব কর্মপাগল মানুষ দেশের জন্য, দেশের জনগণের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। দেশের জনগণকে দুঃসময়ে আগলে রেখেছেন, ভালোবেসেছেন হৃদয় দিয়ে। তিনি চলে গেলেন খালি হাতে কিন্তু নিয়ে গেলেন মানুষের মমত্ববোধ, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও গগনচুম্বী সম্মান ও মর্যাদা। রেখে গেলেন অসমাপ্ত কাজ, লক্ষ কোটি অশ্রুসিক্ত সন্তান। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন এবং জান্নাতের উত্তম মাকাম দান করেন। আমিন!
মোঃ আবদুর রাজ্জাক
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
সমাজকর্ম বিভাগ
মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা।
কে