দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু প্রত্যাবর্তন কেবল একজন নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং একটি সময়ের সমাপ্তি ও আরেকটি সময়ের সূচনার প্রতীক হয়ে ওঠে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন-পরবর্তী প্রথম ভাষণ তেমনই একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত, যা তাৎক্ষণিক আবেগের গণ্ডি ছাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে।
এই ভাষণ কেবল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বক্তব্য হিসেবে নয়, বরং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে আলোচিত হবে।
ভাষণের শুরুতেই তারেক রহমান বলেন, ‘রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে আজ আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি আপনাদের মাঝে।’ এই বাক্যটি ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকা এক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা এমন এক মুহূর্তে ঘটছে, যখন রাষ্ট্র নিজেই এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তাই এই প্রত্যাবর্তন ব্যক্তি তারেক রহমানের নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের রাজনীতির একটি কেন্দ্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ইতিহাসকে একটি ধারাবাহিক সংগ্রামের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘১৯৭১-এ আমাদের এই মাতৃভূমি লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল।’
এই উল্লেখ কেবল আনুষ্ঠানিক নয়; বরং এটি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার একটি সচেতন প্রয়াস। একই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৭৫ সালের সিপাহি বিপ্লব এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে দেখাতে চান—বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার আধিপত্যবাদ, স্বৈরতন্ত্র ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইতিহাস। এই ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান। তার ভাষায়, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতাসহ এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।’
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি এই অভ্যুত্থানকে কোনো দলীয় আন্দোলন হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় প্রতিরোধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গণঅভ্যুত্থানকে দলীয় মালিকানায় পরিণত করলে বিভাজন বাড়ে; আর জাতীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরলে তা ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করে।
এই ঐতিহাসিক বয়ানের পর তারেক রহমান তার বক্তব্যের মূল সুরে আসেন—শান্তি ও নিরাপত্তা। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘বাংলাদেশের যে কোনো মানুষ নিরাপদ থাকুক—এটাই আমার চাওয়া।’ বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালজুড়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, প্রতিশোধের আশঙ্কা এবং সহিংসতার ভয় রাজনীতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে একজন প্রধান রাজনৈতিক নেতার মুখে ‘নিরাপত্তা’ ও ‘শান্তি’র ওপর জোর দেওয়া রাজনীতির ভাষাকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।
তিনি শুধু সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা বলেননি; বরং ১৫ বছরের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কথাও উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে—এই সময়ে অনেক মানুষ গুম হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, এই স্মরণ তিনি প্রতিশোধের ভাষায় করেননি। বরং তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সব বয়স, পেশা ও ধর্মের মানুষ যেন নিরাপদে থাকে। এটি উপমহাদেশীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি ব্যতিক্রমী অবস্থান, যেখানে ক্ষমতার পালাবদলে প্রায়ই প্রতিশোধমূলক রাজনীতি দেখা যায়।
তারেক রহমান বারবার বিশৃঙ্খলা পরিহারের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সব ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে দেশ গঠনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তার ভাষায়, ‘সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবো।’ এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোটি মানুষের প্রত্যাশা তৈরি করেছে—ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাতে ঘিরে। কিন্তু ঐক্য ছাড়া সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তারেক রহমানের ভাষণ সেই বাস্তবতাকেই স্বীকার করে নেয়।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই তিনি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ঐতিহাসিক ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’-এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান।’ এটি কেবল একটি অলংকারপূর্ণ বাক্য নয়; বরং এটি তার রাজনৈতিক দর্শনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। স্বপ্নের রাজনীতি থেকে পরিকল্পনার রাজনীতিতে উত্তরণের এই ঘোষণা তার ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব এবং দেশ গড়ার পরিকল্পনার ৮ দফার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
তারেক রহমানের ৩১ দফা মূলত ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা। এর মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা। তার ভাষণে এসব বিষয় প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে শান্তি ও শৃঙ্খলার ওপর তার জোর এই সংস্কার পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কারণ রাষ্ট্রীয় সংস্কার সংঘাতের মধ্য দিয়ে নয়, বরং স্থিতিশীল পরিবেশেই টেকসই হয়।
রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বড় রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় শান্তির আহ্বান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিশোধ নয়, পুনর্মিলনের পথে হেঁটেছিলেন; নেহরু বিভাজনের ক্ষত সামলাতে চেয়েছিলেন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। তারেক রহমানের ভাষণে সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায়, যখন তিনি যেকোনো মূল্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই ভাষণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন—নিরাপত্তা, সহনশীলতা, রাজনৈতিক সংযম—তারেক রহমানের বক্তব্য সেই পরিবেশ তৈরির আহ্বান হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। বড় একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা যখন প্রকাশ্যে বিশৃঙ্খলা পরিহার ও শান্তি রক্ষার নির্দেশ দেন, তখন তা নির্বাচনী রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের এই বক্তব্য কেবল একটি প্রত্যাবর্তনের ভাষণ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থানপত্র। এতে ইতিহাসের স্মরণ আছে, কিন্তু প্রতিহিংসা নেই; আছে কষ্টের স্বীকারোক্তি, কিন্তু প্রতিশোধের ডাক নেই; আছে স্বপ্ন, তবে তার চেয়েও বেশি আছে পরিকল্পনা। ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’—এই ঘোষণার ভেতর দিয়েই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান শান্তি, ঐক্য ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে।
এই ভাষণ বাস্তবে কতটা রূপ পাবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দলীয় শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার ওপর। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়—শান্তি, নিরাপত্তা ও ঐক্যের ওপর জোর দেওয়া এই বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
লেখক: ডা. একেএম মাজহারুল ইসলাম খান, কবি ও প্রাবন্ধিক