দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন—“আমরা প্রতিশোধের রাজনীতি করতে চাই না, আওয়ামী লীগের মতো হয়রানিমূলক মামলা করব না।” এই একটি বাক্য বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন এক নৈতিক দিকনির্দেশনা হাজির করেছে। কারণ, প্রতিশোধের রাজনীতি এই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তা থেকে মুক্ত হওয়াই এখন এক বড় অর্জন হতে পারে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার পালাবদলের যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, সেখানে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—এই পরিবর্তনের ফলে আসলে কি পুরোনো সংস্কৃতি বদলাচ্ছে, নাকি কেবল তার মুখোশটাই পাল্টেছে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “হয়রানিমূলক মামলা” এখন একটি পরিচিত শব্দ। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দল—তিনটি স্তরে এই সংস্কৃতি গভীরভাবে প্রোথিত। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কেবল বিএনপির প্রায় ৩৫ লক্ষ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দেড় লাখের বেশি মামলা হয়েছিল। এর বড় অংশই ছিল তথাকথিত “রাজনৈতিক মামলা”—যেগুলোর বেশিরভাগই পরবর্তীতে আদালতে টেকেনি। একইভাবে বিএনপি সরকারের সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও ব্যাপক মামলা হয়েছিল, যার মধ্যে অনেক ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অর্থাৎ ক্ষমতায় যেই থাকুক, প্রতিপক্ষকে আইনের জালে জড়িয়ে রাখার কৌশলটি একই থেকেছে। এতে রাষ্ট্রীয় আইনের মর্যাদা যেমন ক্ষুণ্ণ হয়েছে, তেমনি প্রশাসনও হারিয়েছে নিরপেক্ষতার বিশ্বাস।
৫ আগস্টের পর দেশের নানা প্রান্তে নতুন করে যেসব মামলা দায়ের হয়েছে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকেই বলছেন, এগুলোর কিছু সত্যিকারের অপরাধমূলক হলেও, কিছু মামলার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশোধের গন্ধ। গোপালগঞ্জে, ফরিদপুরে, নেত্রকোনায়, ময়মনসিংহে, চট্টগ্রাম দক্ষিণে, খুলনায়—এমন বহু স্থানে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একযোগে মামলা হয়েছে, যেগুলোর অনেকটির প্রাথমিক তদন্তেই প্রমাণ মেলেনি। ফরিদপুরে এমনই এক মামলার অভিযুক্ত ৭২ বছর বয়সী বৃদ্ধ কৃষক আলাউদ্দিন বলেন—“আগে বিএনপি থাকলে মামলা হতো, এখন আওয়ামী লীগ থাকলেও হচ্ছে। কিন্তু আমি তো শুধু মাঠে ধান চাষ করি।” এই বক্তব্যে গ্রামীণ মানুষের ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—রাজনীতির প্রতিশোধচক্র যেন তাদের জীবনকেও বন্দি করে ফেলেছে।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ২৭টি মামলা হয়, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই ছিল সাবেক আওয়ামী লীগ বা যুবলীগ কর্মীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় প্রশাসন জানায়, “উপরে নির্দেশ এসেছে, তালিকাভুক্ত করতে হবে।” অথচ মামলার অধিকাংশই ঘটনার সময় অপ্রমাণিত বা অসম্পূর্ণ অভিযোগে দায়ের হয়। নেত্রকোনা সদরেও একই চিত্র। সেখানে দলীয় পদে না থাকা কয়েকজন বয়স্ক আওয়ামী সমর্থককে অভিযুক্ত করা হয় “সহিংসতার পরিকল্পনা”র অভিযোগে, অথচ মামলার সাক্ষী পরে আদালতে বলেন—“তাদের কাউকে চিনিও না।” চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার কেসগুলো আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে অন্তত ৩৮ জন সাবেক আওয়ামী কর্মী গ্রেপ্তার হন “অস্ত্র লুকানোর” অভিযোগে, কিন্তু পরবর্তীতে আদালত জামিন দেন কারণ কোনো প্রমাণ জমা হয়নি। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে লিখেছে—“এগুলোর অনেকগুলোই স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল, রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয় এমন বলা কঠিন।”
এই বাস্তব চিত্রই বলে দেয়, রাজনৈতিক প্রতিশোধ এখন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা হারানো দলকে ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখা এবং ক্ষমতায় থাকা দলকে ‘অমোঘ’ ভাবা—এই মানসিকতা গণতন্ত্রকে বিকৃত করে। প্রতিটি সরকারই মনে করে, “আমরা ন্যায় করছি,” কিন্তু ভিন্নমতের উপর আঘাত পড়লে সেই ন্যায়ের ভিত্তিই দুর্বল হয়। প্রতিশোধের রাজনীতি আসলে এক ধরনের ভয়ের রাজনীতি—যেখানে প্রতিপক্ষকে চুপ করিয়ে রাখা হয় মামলার ভয় দেখিয়ে, আর অনুসারীদের বশে রাখা হয় প্রতিহিংসার গল্প শুনিয়ে।
জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল এমন এক সময়, যখন মানুষ ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও ভয়ের অবসান চেয়েছিল। অসংখ্য তরুণ প্রাণ দিয়েছে এই বিশ্বাসে যে, এই দেশ আবার হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়। কিন্তু যদি সেই আত্মত্যাগের ফল হয় আবারও একই ধরনের দমননীতি, তাহলে সেই আন্দোলনের আত্মা বাঁচবে না। জনগণ চাইছিল একটি নতুন সূচনা—যেখানে মামলা হবে অপরাধের ভিত্তিতে, মতের নয়। যেখানে বিরোধী দলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হবে, শত্রু হিসেবে নয়।
এখন প্রশ্ন—বিএনপি যে “প্রতিশোধহীন রাজনীতি”র কথা বলছে, সেটি কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হবে? রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, প্রতিশোধের সংস্কৃতি কেবল কথায় বন্ধ হয় না; তার জন্য লাগে কাঠামোগত সংস্কার। স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে, যেখানে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সব মামলার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হবে। জেলা পর্যায়ে নাগরিক মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে, যাতে সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো মামলা পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট দিতে পারে। যারা মিথ্যা মামলা করেছে বা রাজনৈতিক প্রভাবে কাউকে হয়রানি করেছে, সেই পুলিশ বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নইলে “হয়রানিমূলক মামলা” নামের দানব আবারও ফিরে আসবে অন্য রূপে।
রাজনৈতিক প্রতিশোধের এই ধারাবাহিকতা দেশের বিচারব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তদন্ত কর্মকর্তারা অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের নির্দেশে কাজ করেন, অভিযোগপত্র সাজানো হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, আর বিচার প্রক্রিয়া হয়ে পড়ে অবিশ্বাসের খেলা। এতে সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নেয় রাষ্ট্রের প্রতি গভীর হতাশা। তারা আর বিশ্বাস করতে পারেন না যে আদালত বা প্রশাসন ন্যায্য হতে পারে। এই বিশ্বাসহীনতা থেকে জন্ম নেয় আবারও নতুন প্রতিরোধ, নতুন আন্দোলন, নতুন অস্থিরতা। ইতিহাস বলে, যখনই ন্যায়বিচারের পথ বন্ধ হয়েছে, তখনই জনগণ নিজেরাই সেই পথ খুঁজে নিয়েছে—কখনো রাস্তায়, কখনো রক্ত দিয়ে।
তবুও আশা হারানো যাবে না। যদি সত্যিই নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠতে চায়, তাহলে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারের ভিত্তিতেই সেই যাত্রা শুরু হতে হবে। দুর্নীতিবাজ, লুটেরা, নির্যাতনকারী—যেই হোক, তাদের শাস্তি হোক আইনের কাঠামোয়। কিন্তু কেবল আওয়ামী লীগের সমর্থক বা কোনো দলের অনুসারী হওয়ার কারণে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়। বরং এই সময়টিতে প্রয়োজন জাতীয় পুনর্মিলনের, যেখানে সবাই মিলে ঠিক করবে—আইন হবে কারও হাতিয়ার নয়, বরং রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
এই পরিবর্তন টেকসই করতে হলে সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে। বরিশাল, টাঙ্গাইল বা কুষ্টিয়ার মতো জায়গায় সাংবাদিকরা হয়রানিমূলক মামলার খবর প্রকাশ করে নিজেরাই হুমকির মুখে পড়েছেন। এই অবস্থা প্রমাণ করে, শুধু রাজনীতি নয়, মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও দমননীতি এখনও সক্রিয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সত্য কখনো বেরিয়ে আসবে না, আর সত্য চাপা থাকলে প্রতিশোধের বীজ চিরকাল বেঁচে থাকবে।
নতুন বাংলাদেশের পথে হাঁটতে হলে এই বীজ উপড়ে ফেলতে হবে—এখনই। যে বিপুল আত্মত্যাগে জনগণ জুলাই-আগস্টে ইতিহাস লিখেছে, সেই ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষার একমাত্র উপায় হলো প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে মুক্ত হওয়া। আইন হবে সবার জন্য সমান, বিচার হবে প্রমাণভিত্তিক, প্রশাসন হবে জনমুখী—এই প্রতিশ্রুতির বাইরে কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে, আবারও জনতার অভ্যুত্থান হবে, আবারও কোনো দল পালাতে বাধ্য হবে। প্রতিশোধের রাজনীতি কেবল ক্ষমতাকে ধ্বংস করে না, রাষ্ট্রকেও ভেতর থেকে পচিয়ে দেয়। তাই এখনই সময়—এই জঘন্য ট্রেডিশন থেকে বেরিয়ে আসার। যারা অপরাধ করেছে তারা বিচারের মুখোমুখি হোক, কিন্তু কেউ যেন কেবল মত প্রকাশের কারণে আসামি না হয়। কারণ, প্রতিশোধ নয়—ন্যায়বিচারই হোক আমাদের নতুন রাষ্ট্রযাত্রার ভিত্তি, এবং সেখানেই লুকিয়ে আছে নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত জন্ম।
লেখক-
ডা: এ কে এম মাজহারুল ইসলাম খান
কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
তথ্যসূত্র:
1. Human Rights Watch (HRW). “After the Monsoon Revolution: A Roadmap to Lasting Security Sector Reform in Bangladesh.” Published January 27, 2025.
🔗 https://www.hrw.org/report/2025/01/27/after-monsoon-revolution-roadmap-lasting-security-sector-reform-bangladesh
2. Human Rights Watch. World Report 2024: Bangladesh Chapter.
🔗 https://www.hrw.org/world-report/2024/country-chapters/bangladesh
3. Amnesty International. “Bangladesh: Thousands of protesters arrested arbitrarily.” July 29, 2024.
🔗 https://www.amnesty.org/en/latest/news/2024/07/bangladesh-thousands-of-protesters-arrested-arbitrarily/
4. Associated Press (AP News). “UN says Bangladesh crackdown killed hundreds, urges accountability.” August 15, 2024.
🔗 https://apnews.com/article/bangladesh-protests-crackdown-un-rights-2024
5. Reuters. “At least 91 killed as clashes rock Bangladesh, curfew imposed.” August 4, 2024.
🔗 https://www.reuters.com/world/asia-pacific/least-91-killed-bangladesh-clashes-curfew-imposed-2024-08-04/
6. The Guardian. “Bangladesh protests: Students’ uprising turns deadly amid police crackdown.” August 3, 2024.
🔗 https://www.theguardian.com/world/2024/aug/03/bangladesh-protests-student-uprising-turns-deadly
7. Odhikar (Human Rights Organization, Bangladesh). Annual Human Rights Report 2024.
🔗 https://odhikar.org/annual-human-rights-report-2024/
8. The Business Standard (Bangla). “সরকার ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ এবং ৮ আগস্টকে ‘নতুন বাংলাদেশ দিবস’ ঘোষণা.” June 26, 2025.
🔗 https://www.tbsnews.net/bangla/bangladesh/নতুন-বাংলাদেশ-দিবস-ঘোষণা-৫-আগস্ট-গণঅভ্যুত্থান-171972
9. BNP Official Press Briefing / Mirza Fakhrul Islam Alamgir. “BNP does not believe in revenge politics.” (Speech, November 2025).
🔗 https://bnpbd.org/press/2025/november/revenge-politics-statement