দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বড় শহর নয়, মানবিক ও পরিবেশবান্ধব নগরব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে দুই দিনব্যাপী ন্যাশনাল আরবান ফোরাম-২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, ‘আমরা এমন এক নগরব্যবস্থা চাই, যা মানুষের জীবনে সত্যিকারের গুণগত ও দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এমন এক শহর চাই, যেখানে সবার জন্য সুযোগ থাকবে, সুবিচার থাকবে এবং সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে।’ তিনি বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে পরিবেশ ও জলাশয় অক্ষুণ্ন থাকে। নাগরিকরা সেখানে নিরাপদে বসবাস করবেন, আত্মমর্যাদা নিয়ে চলাফেরা করবেন এবং মৌলিক সেবা ও নাগরিক অধিকার সমানভাবে ভোগ করবেন।
শহরগুলো জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ নগর এলাকায় বসবাস করলেও এখান থেকেই জাতীয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্জিত হয়। তবে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন আবাসন, গণপরিবহন, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্য জলবায়ু অভিবাসনের সংকটকে আরও গভীর করছে।
তিনি বলেন, নগরের টেকসই উন্নয়ন কতগুলো বড় অট্টালিকা বা কত কিলোমিটার চওড়া রাস্তা তৈরি হয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। নগরায়নের ফলে কত মানুষের জীবনমান সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়েছে এবং সেই পরিবর্তন কতটা অর্থবহ ও স্থায়ী হয়েছে, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মূল মাপকাঠি।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নগর নীতিমালার কাঠামো শক্তিশালী করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে আমরা স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করি, কেবল একটি সুন্দর নীতিমালা তৈরি করাই শেষ কথা নয়; এটি কাজের সূচনা মাত্র। আসল পরীক্ষা হলো সেই নীতিমালার কার্যকর, বাস্তবমুখী ও টেকসই বাস্তবায়ন।’
নগর নীতিমালার সফল বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি খাত, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাহ্দী আমিন বলেন, নগরের সমস্যাগুলো কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনিক সীমানা মানে না এবং কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। আবাসন, যোগাযোগ, ড্রেনেজ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সমন্বয়ের মাধ্যমেই সামগ্রিক ও টেকসই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
নগরের জটিল সংকট সমাধানে সরকার সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও নিজস্ব সম্পদের পরিধি বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য নয়; বরং প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী শিক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, আধুনিক গণপরিবহন ও সম্মানজনক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। এসব নাগরিক সুবিধা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার।
নগর পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে জলবায়ু সহনশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অবকাঠামো, জনজীবন ও জীবিকার ওপর জলবায়ু পরিবর্তন ইতোমধ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই নদী-নালা, খাল-বিল, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ চত্বরগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সমন্বিত কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
জলাবদ্ধতা ও তীব্র তাপদাহ মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে শহরগুলোকে সুস্থ ও বাসযোগ্য রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
নীতিমালা প্রণয়নে ওপর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে সাধারণ নাগরিক ও তৃণমূলের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানোর আহ্বান জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে প্রতিটি কণ্ঠস্বরকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
নতুন নগর পরিকল্পনাকে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, শহরগুলোতে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি ও নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে তরুণদের মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি মূল শহরের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর যোগাযোগ বাড়াতে দায়িত্বশীল বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থানীয় রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে।
নাগরিক সেবার মান বাড়াতে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
ফোরামের মূল প্রতিপাদ্য ‘ফ্রম পলিসি টু অ্যাকশন’ নতুন নির্বাচিত সরকারের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, ‘মাত্র ছয় মাস আগে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ আজ পরিবর্তনের ইতিবাচক পথে ধাবমান এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের শহরগুলোও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।’
স্থানীয় সরকার বিভাগ, ইউএনডিপি ও যুক্তরাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ফোরামে আরও বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের ডেপুটি আবাসিক প্রতিনিধি সোনালী দয়ারত্নে।
এমএম/