দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দেশে চলমান জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতি, অদূরদর্শিতা ও দলীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষাকে দায়ী করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অনুগত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বিদেশ-নির্ভর জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছিল। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও যথাযথ নজর দেওয়া হয়নি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ভঙ্গুর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ৬৮ বিধির আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সংসদে বিরোধী দলের উত্থাপিত বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক পরিসরে গালফ ওয়ারের মতো সংকট দেখা দেয়। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। তবে কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম এক পয়সাও বাড়ানো হয়নি।
পরবর্তীতে সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি তেল পাচার রোধ এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বাড়তি কর আরোপ না করে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন।
দেশে এলএনজির ঘাটতি মেটানো ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সমুদ্রে ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট স্থাপন সময়সাপেক্ষ হলেও সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। মাতারবাড়ীতে চীন সরকারের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ের চুক্তির আওতায় তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ১৮ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে একটি ভূমিনির্ভর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প থেকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় শত শত কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ও দেশীয় সম্পদের ব্যবহারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশীয় কয়লার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বড়পুকুরিয়ার দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াটের নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সংস্কারকাজ চলছে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বন্ধের বিধিনিষেধের মধ্যেও ২০২১ সালের আগের চুক্তির আওতায় পায়রা দ্বিতীয় পর্যায়ের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শুরু করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সঞ্চালন ও গ্রিড লাইনের ঘাটতি থাকলে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে তা নির্মাণ করবে।
জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও এলপিজি ব্যবহারে সরকারের উদ্যোগের কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট কার্যক্রম হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থল ও সমুদ্র—উভয় এলাকায় কূপ খনন ও অনুসন্ধান জোরদার করেছে।
ইতোমধ্যে ভোলায় গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ সচল করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে পাওয়া গ্যাসকে কেন্দ্র করে সার কারখানা ও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশে এলপিজির চাহিদা মেটাতে মাতারবাড়ীতে বড় পরিসরে এলপিজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস খালাস নিশ্চিত করতে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাসমান সিবিএস প্রযুক্তির টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিরোধী দলের প্রস্তাবিত সময়সীমার প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একটি সরকার যখন ভঙ্গুর আর্থিক ও জ্বালানি ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, তখন সবকিছু রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী ছয় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার যে পরিকল্পনা নিয়েছেন, তা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়লা, বায়ু, সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ে দুর্যোগসহনশীল ও টেকসই জ্বালানি খাত গড়ে তোলা বলে জানান তিনি। এর মাধ্যমে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে এবং শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এমএস/