দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) জনবান্ধব, দক্ষ ও আধুনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, করদাতারা এনবিআরকে তাদের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান। দেশের মানুষ এনবিআরকে ভয় করবে না বরং বিশ্বাস করবে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর করদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়ে যায়।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এনবিআরের কার্যক্রম, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার নীতি ও পদ্ধতি এবং এর আধুনিকায়নসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনেছেন। তবে তিনি এই রাজস্ব সম্মেলনকে সাধারণ কোনো সম্মেলন হিসেবে দেখেন না।
তিনি বলেন, এনবিআরের কার্যক্রমের সাফল্যের ওপর সরকারের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সফলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই আজকের সম্মেলন আগামী দিনে এনবিআরের আরও বেশি সাফল্যের পথনির্দেশনার সম্মেলন হবে বলে আশা করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কী ধরনের ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে, তা দেশের যেকোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের চেয়ে এনবিআর কর্মকর্তারা বেশি অবগত।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অভিশাপ থেকে রাষ্ট্রের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও মুক্ত থাকতে পারেনি।
এনবিআরের নীতি ও নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থে কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা, কারও প্রতি বিরূপ মনোভাব এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতা এনবিআরকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে এনবিআরের ওপর মানুষের আস্থা বিনষ্ট হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’
দেশের জনগণ বর্তমানে এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষ করে করদাতারা এনবিআরকে তাদের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চান।
দক্ষ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই জনআস্থা অর্জন সম্ভব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করদাতাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব এনবিআরকেই নিতে হবে। বর্তমান সরকার এনবিআর তথা রাজস্ব কাঠামোকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিতাড়িত পতিত পলাতক ফ্যাসিস্ট চক্র দেশকে চূড়ান্তভাবে একটি ঋণনির্ভর ও আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়েছে। বর্তমান সরকার শুধু বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অতিরিক্ত ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার নীতির বিরোধী বলে জানান তিনি।
তাই রাজস্ব আহরণে অভ্যন্তরীণ আয়ের ক্ষেত্র ও উৎস বাড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আয়ের ক্ষেত্র ও উৎস বাড়াতে সরকার গণমুখী উৎপাদন নীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়ন বাড়বে, মানুষের আয় বাড়বে, ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে এবং জনগণ আরও উন্নত সরকারি সেবা পাবে।
এ ক্ষেত্রেও এনবিআরের আরও দক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা অনস্বীকার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একের পর এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। ব্যবসার নতুন নতুন মডেল তৈরি হচ্ছে। এর ফলে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কর বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবর্তিত বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যা, সম্ভাবনা, সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, হস্তান্তর মূল্য নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, বাণিজ্য অর্থায়ন, আর্থিক অপরাধ, অর্থপাচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উপাত্ত বিশ্লেষণের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কেও সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে।
শুধু প্রচলিত কর আইন জানা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন আধুনিক রাজস্ব কর্মকর্তার অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামগ্রিক কর্মক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি ভালো রাজস্ব ব্যবস্থা এমন হওয়া দরকার, যেখানে মানুষ কর দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। কর প্রদান পদ্ধতি যথাসম্ভব দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত এবং সহজ করা দরকার।
অনলাইনে কর পরিশোধ করা সম্ভব হলে করদাতার অফিসে আসার প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, যথানিয়মে কর আদায় করা একজন করদাতার জন্য যেমন লাভজনক, একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকারের জন্যও ইতিবাচক।
এনবিআর কর্মকর্তাদের আচরণ ও কার্যক্রমের মাধ্যমে করদাতার মনে এই বিশ্বাস জন্ম নিলে কর আদায় আরও সহজ হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে কর-জিডিপি অনুপাত সক্ষমতার তুলনায় এখনো অনেক কম। করভিত্তিও তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ। অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক। সীমিতসংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের উদ্দেশ্য শুধু বেশি কর আদায় করা নয়; বরং বেশি সংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। নিয়মিত কর দেওয়া একজন করদাতাকে রাষ্ট্র যেমন সম্মানিত করবে, একইভাবে যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কর পরিহার করছেন, তাঁকেও কর প্রদানের জন্য যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ বা আগ্রহী করে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কর ব্যবস্থাপনা ও কর আদায় পদ্ধতি সহজ এবং দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। যাতে মানুষ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কর দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সেই ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, একই করদাতাদের ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির নীতি টেকসই পদ্ধতি নয়।’ বরং কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের যথাযথ নিয়মে করের আওতায় আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য ডিজিটাল ও আধুনিক, উপাত্তভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ভ্যাটকে আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজস্ব উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তবে ভ্যাট ব্যবস্থার সফলতা এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে বলে জানান তিনি। ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও এনবিআরকে নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কাস্টমস, ভ্যাট কিংবা ট্যাক্স আদায় শুধু প্রয়োগের বিষয় নয়। বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর ভ্যাট ও করদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ এই প্রতিষ্ঠানকে ভয় না করে, বিশ্বাস করে। দেশের স্বার্থে এনবিআরকে জনগণের আরও বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শেষ দিকে রাজস্ব আহরণের সম্প্রতি ইতিবাচক ধারার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ইতিবাচক ছিল। এটি প্রমাণ করে, ‘আপনারা পারেন, আপনারাই পারেন, এবং আপনারা অবশ্যই পারবেন, ইনশাআল্লাহ।’
এ জন্য শুধু দেশপ্রেম ও আন্তরিকতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বার্থে আমরা সবাই মিলে একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলি।’ আরও সমৃদ্ধ, আরও বিনিয়োগ ও আরও ব্যবসাবান্ধব একটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশা জানিয়ে রাজস্ব সম্মেলনের সফলতা কামনা করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কে