দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ঐতিহ্যগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছি। অন্যদিকে, আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহ, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র সৃষ্টি করছি।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের নবম দিনের বৈঠকে নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর লিখিত প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান তিনি। এদিন প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে উত্থাপিত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের নবম দিনের বৈঠকে সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালী তার লিখিত প্রশ্নে জানতে চান, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও বহুমুখীকরণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
লিখিত জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অভিবাসন আজ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় কোনো একক অঞ্চল বা শক্তিকেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল না থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রদর্শিত বাস্তববাদী ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে আমরা দুঃখজনকভাবে দেখেছি, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করেছে। বর্তমান সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট- পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা-এসব নীতিই আমাদের কূটনৈতিক কার্যক্রমের ভিত্তি।’
মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো কূটনৈতিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা। আমরা একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ঐতিহ্যগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছি; অন্যদিকে, আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহ, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র সৃষ্টি করছি।
প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তিনি জানান, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ন্যায্যতা, সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে। ভারতের সাথে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতাসহ বিদ্যমান অমীমাংসিত বিষয়সমূহ সমাধানে আমরা গঠনমূলক কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছি। এছাড়া মিয়ানমারের সাথেও বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে বাংলাদেশ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কল্যাণে সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সার্ককে পুনরায় কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে বিমসটেককে গতিশীল করার জন্যও আমরা কাজ করছি। অর্থনৈতিক কূটনীতি বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অর্থনৈতিক উদারীকরণ, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারণে কার্যকর নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়। আমরা সেই ধারাবাহিকতাকে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উদ্ভাবন, গবেষণা ও উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল সংযোগ এবং ব্লু ইকোনমির মতো নতুন ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার জন্য আমরা কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করেছি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকাকে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার ও পণ্যের একটি ম্যাপিং এর কাজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সাথে সমন্বয় করে পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। বর্তমানে আমাদের শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় শ্রমবাজারের বহুমুখীকরণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। মধ্য প্রাচ্য ও ইউরোপের প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান বাজারগুলোতে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ একটি আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী এবং ফলপ্রসূ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, সক্রিয় অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কার্যকর বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার মর্যাদা প্রভাব আরও সুদৃঢ় করবে এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে ইনশাআল্লাহ।’
/অ