দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন হয়। দেশের তরুণ সমাজ থেকে নানান শ্রেণি-পেশার মানুষ মনে করে, ভারতের সহযোগিতাই হাসিনাকে স্বৈরাচারে পরিণত হতে সহায়তা করে। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, পানির হিস্যা, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক ইস্যুতে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ ভারতবিরোধী মনোভাবকে আরও প্রবল করেছে।
এসব ইস্যুর ফলে বাংলাদেশের তরুণরা ভারতবিরোধী হয়ে যাচ্ছে কিনা তা খোঁজার চেষ্টা করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। নিচে প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো—
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো আবারও গ্রাফিতি ও স্লোগানে ভরে গেছে— ক্ষোভ আর বিদ্রোহের ছোঁয়ায় কখনও তীব্র, কখনও বিদ্রুপপূর্ণ, আবার কখনও যেন কাব্যের ছন্দে লেখাগুলো দেয়াল ও করিডোর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। এই দেয়ালগুলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই তরুণ প্রজন্মের অভ্যুত্থানকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনাকে উৎখাত করেছিল।
একসময় গণতন্ত্রের প্রতীক বলা হতো তাকে, কিন্তু সমালোচকরা বলছেন— সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্রমেই স্বৈরশাসক হয়ে উঠেছিলেন। পরবর্তীতে আন্দোলনের মুখে পদত্যাগের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান।
শিক্ষার্থীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট ছোট গ্রুপে জমায়েত হয়ে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করে। এক অগোছালো মাঠে ছোট পরিসরে চীনা নববর্ষ উদযাপনের দৃশ্য দেখা গেছে, যা বাংলাদেশে বেইজিং ও দিল্লি দু’পক্ষের প্রভাব বিস্তারে তীব্র লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা অনেক তরুণের জন্য প্রথম সত্যিকারের ভোটের অভিজ্ঞতা।
শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষমতা গ্রহণ করেন। আর হাসিনা এখন দিল্লিতে নির্বাসিত; ভারত তাকে ফেরত পাঠাতে রাজি নয় যেন তিনি ২০২৪ সালের নির্মম দমনপীড়নের দায়ে (জাতিসংঘের মতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল, অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে) মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হন। তার আওয়ামী লীগ—দেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল, যা প্রায় ৩০% ভোটের অংশীদার—এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন সেই উদার-মধ্যপন্থী শূন্যস্থান দখল করার চেষ্টা করছে। প্রধান ইসলামী দল, জামায়াতে ইসলামী, অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া একটি দলের সঙ্গে জোট বেঁধেছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লোগানগুলো শুধু দেশের গণতন্ত্র নিয়ে নয়; তারা সীমান্তের ওপারেও ইঙ্গিত করছে। দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘দিল্লি নয়, ঢাকা’ লেখা স্লোগান, আবার নারীদের ঐতিহ্যবাহী শাড়িতেও তা খোদাই করা। তরুণদের মধ্যে ‘আধিপত্যবাদ’ শব্দ দৈনন্দিন কথোপকথনের অংশ হয়ে গেছে, যা বাংলাদেশের ওপর ভারতের দীর্ঘ প্রভাব বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২৪ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম মনে করে— ভারত বহু বছর ধরে আমাদের দেশে হস্তক্ষেপ করে আসছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের বিতর্কিত একদলীয় নির্বাচনের পর।’
এই ক্ষোভ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে তীব্র প্রভাবিত করেছে এবং বড় আকারের ভারতবিরোধী মনোভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে একসময় প্রতিবেশী কূটনীতির মডেল হিসেবে পরিচিত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তলানিতে রয়েছে।
স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ-এর রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক অভিনাশ পালিয়াল বলেন, ‘দিল্লি ঢাকায় সংগ্রাম করছে, কারণ বাংলাদেশে ব্যাপক আকারে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে।’
ষ সময়ে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠা হাসিনাকে সমর্থনের জন্য অনেকে ভারতকে দোষারোপ করেন। এবং ভারতকে অত্যাচারী প্রতিবেশী হিসেবে দেখা হয়। তারা মনে করে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনগুলো ভারতের ‘সমর্থনে’ হয়েছিল।
মোশাররফের মতে, ‘ভারত হাসিনার শাসনকে কোনো চাপ ছাড়াই প্রশ্নাতীতভাবে সমর্থন করেছে। বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, গণতন্ত্রের ধ্বংস ভারতের সমর্থনেই হয়েছিল।’
এই ধারণার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ক্ষোভও মিলিত হয়েছে; যেমন— সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানির নায্য হিস্যা নিয়ে বিরোধ, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এবং ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও টেলিভিশন স্টুডিও থেকে উসকানিমূলক বক্তব্য সেই ধারণা আরও প্রবল করেছে যে, ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম সমান হিসেবে নয়, বরং একটি অনুগত পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে দেখে।
স্থানীয় গণমাধ্যমে অনেক প্রতিবেদন হয়েছে যে, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশেকে প্রতারিত করেছে। রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমেও একটি প্রধান দৈনিককে ‘ভারতের এজেন্ট’ হিসেবে বন্ধ করার প্রচারণা চলছে। উভয় দেশই বেশিরভাগ ভিসা সেবা স্থগিত করেছে।
ক্রীড়া ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও মনোভাব প্রতিফলিত হচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ভারতীয় প্রিমিয়ার লীগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়া এবং বাংলাদেশের টি২০ বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারতের পরিবর্তে শ্রীলংকায় স্থানান্তরের অনিচ্ছা অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে।
‘নিশ্চিতভাবেই, ভারত বাংলাদেশে সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। কিন্তু এই সংযোগকে ইতিবাচক ফলাফলে রূপান্তর করা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জিং,’ বলছেন পালিয়াল।
তবে দিল্লি সত্যিই তার সংযোগ সম্প্রসারণ শুরু করেছে।
গত মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বিএনপি নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শোক জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ১৭ বছরের নির্বাসনের পর সম্প্রতি দেশে ফেরত আসা ৬০ বছরের তারেক রহমানকে এখন নির্বাচনের প্রধান নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারত ইসলামী শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াত-ই-ইসলামীর এক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, গত বছর ভারতীয় কর্মকর্তারা তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে চারবার যোগাযোগ করেছেন, যার মধ্যে একটি ছিল ভারতীয় হাইকমিশনের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠান।
তবে এই কৌশলগত পরিবর্তনগুলো সামগ্রিক সম্পর্কের অবনতি উত্তরণে কাজ করছে না। দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান শীতল সম্পর্ক এমন নিচের পর্যায়ে পৌঁছেছে, যো আগের কোনো সংকটের সময়ও দেখা যায়নি।’ ‘নিঃসন্দেহ এটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে নীচের স্তর,’ যোগ করেন তিনি।
শেখ হাসিনার ১৭ বছর শাসনামলে ঢাকা ‘প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভারতের জন্য খুলে দিয়েছিল’—নিরাপত্তা সহযোগিতা, ট্রানজিট, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক। আহমেদ বলেন, ‘আজ কিছুই চলছে না—না মানুষ, না সদিচ্ছা।’
যা সন্দেহকে রাগে পরিণত করেছে, তা হলো হাসিনার উৎখাতের পর দিল্লির প্রতিক্রিয়া। বহু বাংলাদেশি আশা করেছিলেন, ভারত তাদের নীতি পুনর্বিবেচন করবে, যা মূলত একটি দলকে সমর্থনের ওপর নির্ভর ছিল। কিন্তু ভারত যেন তার উল্টোটা করেছে—হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং ভিসা ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরও কঠোর করা। কামাল আহমেদের মতে, ‘ঢাকায় যেভাবে বার্তাটি পৌঁছেছে তা হলো— বাংলাদেশকে ‘প্রতিবেশী হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না’।
উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। যখন ভারতীয় রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশি অভিবাসীদের হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন ‘বাংলাদেশকে গাজায় ইসরায়েলের মতো শিক্ষা দেওয়া উচিত’।
এ বিষয়ে আহমেদ প্রশ্ন করেন, ‘বাংলাদেশিরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে— আপনি আশা করছেন?’
আহমেদ বলেন, ‘সংস্কৃতি, বাণিজ্য, সম্মান—এগুলো একমুখী বিষয় নয়। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান ভারতীয় নেতৃত্ব যেভাবে এটি পরিচালনা করছে, তা এভাবেই।’
তবুও ঢাকার কর্মকর্তারা মনে করেন, সম্পর্ককে কেবল সংকটের চোখ দিয়ে দেখা ঠিক হবে না।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের মতে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বহুমাত্রিক, যা কেবল রাজনীতির নয়; ভূরাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত। ‘আমরা ৫৪ নদী ভাগাভাগি করি… ভাষা শেয়ার করি, একই ইতিহাস আছে,’ তিনি বলেন।
তবে আলম স্বীকার করেন, জনমত তীব্রভাবে বিরোধী হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশিদের জিজ্ঞেস করুন— কেন তারা ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেনি?’ অনেকেই একই উত্তর দেয়, শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন এবং ভারতের ‘সমর্থন’।
‘তারা আরও বলেন— হাসিনাকে ভারত সবসময়ই সমর্থন করেছে,’ যোগ করেন প্রেস সচিব।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর হাসিনার ভারতে পালানো বিশেষভাবে ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রয়ে গেছে।
‘শত শত তরুণ নিহত হয়েছিল… আর তারপর তিনি ভারতে পালিয়ে গেলেন,’ শফিকুল আলম বলেন। একজন অপমানিত নেত্রী হিসেবে নয় বরং সরকারের প্রধান হিসেবে দেখা হয়েছে, যা রাগকে আরও বাড়িয়েছে।
শফিকুল আলম ভারতীয় গণমাধ্যমেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের প্রতি ধারাবাহিক সহিংসতার দাবি ‘একটি বড় ধরনের অপতথ্যমূলক প্রচারণা’।
তার মতে, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে, কিন্তু নিয়মিতভাবে এগুলোকে ধর্মীয় সহিংসতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ‘এসে দেখুন,’ তিনি ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। ‘মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন এবং দেখুন আসলে কী ঘটেছে,’ বলেন শফিকুল আলম।
অপরদিকে ভারত বলছে, সংখ্যালঘুদের ওপর ২ হাজার ৯০০-এর বেশি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে তারা—যেখানে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও জমি দখল অন্তর্ভুক্ত—যা সব ‘মিডিয়ার অতিরঞ্জন’ বা রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে বাদ দেওয়া যায় না।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ মনে করেন, এই বিভাজন কেবল ভুল বোঝাবুঝি নয়—এটি অনেক গভীর। ‘এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে,’ তিনি বলেন।
তিনি মনে করেন, সময়ের পরিক্রমায় সম্পর্ক সংকুচিত হয়ে শুধু ‘একটি দল বা ব্যক্তির সঙ্গে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত হয়ে গেছে’, যা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রকৃত সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে না।
দীর্ঘমেয়াদী বিরোধ ক্ষতি আরও বাড়িয়েছে। আলী রীয়াজ যুক্তি দেন, পানির হিস্যা সম্পর্কের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে। ‘যদি আপনি পানি নিয়ন্ত্রণ করেন, সম্পর্ক সঙ্গে সঙ্গে অসম হয়ে যায়।’
সীমান্ত হত্যাকাণ্ড আরও গভীর ক্ষত তৈরি করেছে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে। ‘এটি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশিদের জীবনকে কীভাবে দেখছে তা বোঝায়।’ নির্দিষ্ট সীমান্ত ঘটনায় ভারত তার বাহিনীর অবৈধ হত্যাকাণ্ড অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিষয়গুলো কেবল সাময়িক নয়, বরং অসমতার প্রতীক।
সমালোচকদের মতে, এই অসমতা হাসিনার পতনের পর আরও দৃঢ় হয়েছে। ইউনূসের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন মনে করেন, ভারত পুনঃমূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সুযোগ হাতছাড়া করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা অনেকবার এগোনোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু ভারতের প্রতিক্রিয়া এক সময় আসে, এক সময় যায়—অস্থির ছিল।’
অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশে ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শান্তিপূর্ণভাবে ‘অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন’ করার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক চাপ এখন অর্থনৈতিক সম্পর্কেও প্রতিফলিত হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরও বেশি হতে পারত যদি শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধা কমানো এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করা যেত, বলছেন সিপিডি-এর ফাহমিদা খাতুন। ‘রাজনৈতিক চাপ অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে,’ তিনি যোগ করেন।
তবে রাষ্ট্র পর্যায়ে এই কঠোরতা সবসময় ঠিক তেমনভাবে দেখা যায় না।
সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চের (যা ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচিত) ফাতিমা তাসনিম জুমা, বলেন, ‘যখনই আমি ভারত শুনি, আমি মনে করি এটি আমার শত্রু। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এমনটি কাজ করে না।’
জুমা বলেন, তিনি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাতে বড় হয়েছেন; আত্মীয়রা সহজেই সীমান্ত পার হতে পারতেন। ‘আমাদের সংঘাত ভারতীয় সরকার বা কাঠামোর সঙ্গে। মানুষের সঙ্গে নয়,’ বলেন জুমা।
ভারত–বাংলাদেশের এ সম্পর্ক মেরামত দ্রুত সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম, ‘শুধু নির্বাচন বা নতুন সরকার আসছে বলে সম্পর্কের পুনঃসূচনা সহজ হবে না। পেছনের সমস্যাগুলো থেকে যাবে।’
তবুও, এই বিভাজন চিরস্থায়ী নয়। ‘কোনো রাষ্ট্রের সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়,’ আলী রীয়াজ বলেন। তবে মেরামতের ভার মূলত দিল্লির ওপর এবং এটি করতে হবে ঢাকার ক্ষমতায় যে-ই থাকুক তার সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে বলে মনে করেন তিনি।
আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে প্রস্তুত। তবে ভারতের এমন একটি পুনঃসূচনা দরকার, যা ঢাকার ক্ষমতায় যারাই থাকুক তাদের সঙ্গে কাজ করবে।
রাজনৈতিক নেতারা বিষয়টিকে শুধু কৌশলগত মনে করছেন, বরং নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রয়োজন বলে মনে করেন।
বিএনপি নেতা তারেক রহমানের অন্যতম উপদেষ্টা মাহদী আমিন সরাসরি বলেন, ‘জাতি যত বড়, দায়িত্ব তত বেশি।’
তিনি যুক্তি দেন, মানুষ ও মানুষের সম্পর্ক কেবল তখনই বৃদ্ধি পেতে পারে যখন ভারত তার নীতি বাংলাদেশিদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখবে, কেবল সরকারের পছন্দের সঙ্গে নয়।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘উভয় দেশের যারা দায়িত্বে আছেন তারা যদি আন্তরিকভাবে কাজ করেন, বর্তমান বাস্তবতা মেনে নেন এবং একে অপরকে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে দেখেন, তাহলে একটি গঠনমূলক সম্পর্ক সম্ভব।’
মেরামতের সেই সম্ভাবনা এখনও বিদ্যমান—এবং একটি নতুন সরকার তা পরিবর্তন আনতে পারে।
‘বর্তমান পরিস্থিতি কেবল কূটনৈতিক শীতলতার চেয়েও বেশি, আর কাঠামোগত বিভাজনের চেয়েও কম,’ উল্লেখ করেন পলিওয়াল। ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অংশীদার হওয়ায় ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরকে উপেক্ষা করতে পারবে না বলেও মনে করছেন ভূরাজনীতির এ বিশেষজ্ঞ।
এবি/