দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতায় নেতৃত্ব দিয়েছে নারীরা। গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই বললেই চলে। এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা আনুপাতিক হার মাত্র চার শতাংশ। অন্তত ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনীতির মূল স্রোত থেকে আবারও সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে নারীদের। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, দলীয় অনীহা ও নানান সমীকরণে আগামীতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব প্রায় সম্পূর্ণভাবে পুরুষদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হতে যাচ্ছে। আর এতে বাংলাদেশে নারীদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও তাদের অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বলে মনে করছে সংবাদ সংস্থা এএফপি।
সংবাদ সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের একটি, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন নারীরা। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কোনো নারী নেই বললেই চলে।
এই ভোটের পথ তৈরি করা আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে তাদের বড় অংশই বাদ পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছে এএফপি। আগামী সপ্তাহে যেই দলই জয়ী হোক না কেন, ফলাফল হবে এমন একটি সরকার, যা প্রায় সম্পূর্ণভাবে পুরুষ দ্বারা পরিচালিত, বলা হয় প্রতিবেদনে।
প্রথমবারের ভোট দিচ্ছেন ২০ বছর বয়সী আরিয়ানা রহমান— এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আমার দেশ খুব উদার না হলেও, আমরা গর্ব করতে পারতাম যে শীর্ষে দুজন নারী নেত্রী ছিলেন। যেই জিতুক না কেন, প্রধানমন্ত্রী হতেন একজন নারী।’
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নির্বাচনে ৩০০টি সংসদীয় আসনে ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৭৬ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা মোট প্রার্থীর চার শতাংশেরও কম। অধিকাংশ দলই তাদের মনোনয়নে কেবল পুরুষদেরই রেখেছে।
বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল দক্ষিণ এশীয় দেশে নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বরাবরই সীমিত। স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ ২২ জন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১৮ সালে। তবে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন, আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন দুই নারী নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া।
চার দশক দলটির নেতৃত্ব দেওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতা ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত ডিসেম্বরে মারা যান। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন।
‘নিয়ন্ত্রিত, অপমানিত, নেতিবাচক মূল্যায়ন’
প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক অধিকারকর্মী আশা করেছিলেন, শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানো এই অভ্যুত্থান নারীদের জন্যও আরও সমতার পথ খুলে দেবে।
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করলেও, তার সরকার কমিশনটিকে পাশ কাটিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। এদিকে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রকাশ্য সমর্থন বেড়েছে, যারা নারীদের জনজীবনে অংশগ্রহণ সীমিত করতে চায়।
দীর্ঘদিন দমন-পীড়নের পর শক্তি ফিরে পাওয়া কট্টরপন্থীরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও অন্যান্য জনসমাবেশ থেকে নারীদের বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছে, এমনকি নারী ফুটবল ম্যাচের মতো কার্যক্রমেও নিষেধাজ্ঞা চেয়েছে।
‘ঐতিহাসিকভাবে আমাদের দেশে নারীদের অংশগ্রহণ বরাবরই কম, কিন্তু অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা ছিল, তা আর বাস্তবায়িত হয়নি,’ বলেন নারী অধিকার সংগঠন ‘নারীর রাজনীতিক অধিকার ফোরাম’-এর মুখপাত্র মাহরুখ মহিউদ্দিন।
‘দীর্ঘদিনের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নারীদের প্রায়ই গৃহস্থালির কাজেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। যারা প্রতিবাদ করতে সাহস করেন, তারা প্রায়ই শত্রুতার মুখে পড়েন,’ তিনি যোগ করেন।
‘নারীরা নিয়ন্ত্রিত, অপমানিত… শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণেই তাদের বিচার করা হয়। এটাই বাস্তবতা,’ বলেন অভ্যুত্থানের নেত্রী উমামা ফাতেমা।
এমনকি অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের গঠিত দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) তাদের ৩০ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র দুইজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
‘আমি আমার দলের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারি না, আর সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আমাদের উপস্থিতি ছাড়াই নেওয়া হয়,’ বলেন এনসিপির সাবেক নেত্রী সামান্থা শারমিন।
এনসিপি জোটবদ্ধ হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে—সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দলটি এবং ৩০টি দলের একটি, যারা একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি।
‘নারী নেত্রী থাকতে পারে না’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সমাজ এখনো নারীদের রাজনীতির জন্য ‘প্রস্তুত ও নিরাপদ’ নয়।
দলটির নারী শাখার নেত্রী নুরুননেসা সিদ্দিকা বলেন, ‘একটি ইসলামী সংগঠনে নারী নেতা থাকতে পারে না—আমরা সেটাই মেনে নিয়েছি।’
এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অল্প কয়েকজন নারীর একজন মনীষা চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরেই কেবল প্রতীকী।
১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ৩০০ জন সংসদ সদস্য সরাসরি নির্বাচিত হন, আর অতিরিক্ত ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত তালিকা থেকে পূরণ করা হয়।
‘সংরক্ষিত আসনের ধারণা অপমানজনক,’ বলেন চক্রবর্তী। তার বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল ২৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে—এই নির্বাচনে সর্বোচ্চ অনুপাত।
‘লবিং, অভ্যন্তরীণ পক্ষপাত, আত্মীয়করণ—সবকিছু মিলিয়ে সংসদে নারীদের অংশগ্রহণকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করা হয়েছে,’ তিনি এএফপিকে বলেন।
সাবেক মন্ত্রী আবদুল মঈন খান বলেন, সংরক্ষিত আসনগুলো ‘নারীদের একটি ভিত্তি গড়ে দিতে সহায়তার জন্য ছিল’, কিন্তু ‘উল্টো ফল হয়েছে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একমাত্র নারী সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘সম্ভাবনাময় নারী নেত্রীরা দলীয় সমর্থনের অভাবে প্রায়ই হারিয়ে যান।’
আর যদিও জিয়া ও হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনি উল্লেখ করেন—দুজনই পারিবারিক উত্তরাধিকারের মাধ্যমে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন।
তরুণী ভোটার আরিয়ানা রহমান আশঙ্কা করছেন, সামনে দীর্ঘ সংগ্রাম অপেক্ষা করছে। ‘এই নির্বাচনে আরও বেশি নারী থাকলে আমি নিজেকে ভালোভাবে প্রতিনিধিত্বশীল মনে করতাম,’ তিনি বলেন। ‘আগামী কয়েক বছর নারীদের জন্য আরও বেশি প্রতিকূল হতে পারে।’
এবি/