দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

প্লট দুর্নীতি মামলায় আদালতের বিচার ও দণ্ডাদেশ নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনি ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তার জবাব দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন।
মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) সংস্থার জনসংযোগ দপ্তরের মাধ্যমে দেয়া জবাবে তিনি বলেন, সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত টিউলিপ সিদ্দিকের বিচার ও দণ্ড সংক্রান্ত মন্তব্য ও উদ্বেগ স্পষ্টভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
‘এ কারণে, একটি স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে আমরা তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মামলার নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেছি।’ গত সোমবার (১ ডিসেম্বর) সকালে ঢাকার বিশেষ জজ-৪ এর বিচারক রবিউল আলম প্লট বরাদ্দ নেয়ার অভিযোগে করা মামলার রায়ে শেখ হাসিনাকে ৫ বছর, শেখ রেহানাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে ২ বছর করে কারাদণ্ড দেন। সোমবার নিজের দুই বছরের কারাদণ্ড হওয়ার রায়কে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ‘প্রতিহিংসা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন টিউলিপ সিদ্দিক। তার ভাষায়, পুরো বিচারপ্রক্রিয়াটি ছিল ‘বিশৃঙ্খল, হাস্যকর ও প্রহসনমূলক’।
টিউলিপের এমন প্রতিক্রিয়ার জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘মামলার নথিপত্র থেকে প্রতীয়মান হয় যে প্রতিটি মামলাই মিস সিদ্দিকের খালা (ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা), তার মা শেখ রেহানা এবং তার ভাই-বোন ও খালাতো ভাই-বোনদের নামে প্লট বরাদ্দ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী দেখা যায়, একটি বিচারাধীন মামলায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার খালার দায়িত্বকালীন সময়ে টিউলিপ সিদ্দিক নিজেও একটি অতিরিক্ত প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা এবং টিউলিপ সিদ্দিকসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বিচার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, তিনটি মামলার মধ্যে একটি মামলার বিচার এরইমধ্যে শেষ হয়েছে এবং সেখানে টিউলিপ সিদ্দিক তার মা ও ভাই-বোনদের জন্য প্লট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে খালাকে প্রভাবিত করার অভিযোগে দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।’ আদালতে আনা অভিযোগের বরাতে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘টিউলিপ সিদ্দিক তার খালাকে প্রভাবিত, প্রলুব্ধ ও রাজি করিয়েছিলেন, যাতে তিনি নিজের সরকারি অবস্থানের অপব্যবহার করে সিদ্দিক পরিবারের জন্য প্লট বরাদ্দ নিশ্চিত করেন।’ ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, এই সাক্ষীদের মধ্যে কয়েকজন শপথ নিয়ে বলেন যে টিউলিপ সিদ্দিক, যিনি তার খালার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, সংশ্লিষ্ট প্লট বরাদ্দ পাওয়ার জন্য নিজের প্রভাব খাটিয়েছেন। তাদের সাক্ষ্য এবং টিউলিপ সিদ্দিক, তার মা ও ভাই-বোনদের নামে প্লট বরাদ্দের পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, সব মিলিয়ে নির্দেশ করে যে তিনি প্লট সংগ্রহের অবৈধ প্রক্রিয়ায় গভীরভাবে জড়িত ছিলেন; শুধু ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া মামলাতেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও। তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণ দণ্ডবিধির ১৬১, ১৬৩, ১৬৪, ১৬৫(ক), ২০১, ২১৭, ২১৮, ৪০৯ ও ৪২০ ধারাসহ দুর্নীতি দমন আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারার অধীনে অপরাধে সহায়তার শামিল। আবদুল মোমেন বলেন, এই পারিপার্শ্বিক প্রমাণ আরও শক্তিশালী হয় এই তথ্য দ্বারা যে টিউলিপ সিদ্দিক তার খালা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ওপর নিজের প্রভাবের অপব্যবহার করে একটি প্লটও (প্লট নং সিডব্লিউএন(এ)-২৭, পরে পরিবর্তিত হয়ে প্লট নং ০৫, ব্লক এনই(এ), গুলশান, ফ্ল্যাট নং বি/২০১, হাউস নং ৫এ ও ৫বি, যাকে এখন ১১৫ ও ১১বি, রোড নং ৭১, গুলশান-২ নামে পুনঃনামকরণ করা হয়েছে) পেয়েছিলেন। দুদকের বিবৃতিতে বলা হয়, এগুলো কোনো দূরবর্তী কৃষিজমি নয়; বরং ঢাকার সবচেয়ে ব্যয়বহুল এলাকাগুলোর একটিতে অবস্থিত অত্যন্ত মূল্যবান প্লট। এসব প্লট এতটাই বৃহৎ যে সেখানে বড় আকারের বাসভবন বা বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। জনসংখ্যার চাপ কমাতে ঢাকায় আবাসন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত এই সরকারি জমি পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর নিকটজনদের মাঝে বরাদ্দ করা হয়, যা পারিবারিক সম্পদ বৃদ্ধিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘টিউলিপ সিদ্দিকের সঙ্গে অফশোর কোম্পানির সহায়তায় কেনা লন্ডনের একাধিক সম্পত্তির যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে, সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে লন্ডন ও ঢাকার মতো দুটি ব্যয়বহুল নগরে একাধিক সম্পত্তি ক্রয়ের সামর্থ্য অর্জন করেন? আমরা এই বিষয়ে টিউলিপ সিদ্দিকের ব্যাখ্যা শুনতে আগ্রহী ছিলাম; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার অনুপস্থিতিতেই বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘টিউলিপ সিদ্দিকের দাবি যে তিনি অভিযোগের জবাব দেয়ার সুযোগ পাননি, তা সম্পূর্ণ অসত্য। তাকে নিয়ম অনুযায়ী আদালতে উপস্থিত থাকা এবং নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তিনি না স্বশরীরে আদালতে হাজির হন, না আইনজীবীর মাধ্যমে নিজেকে প্রতিনিধিত্ব করান। সামগ্রিকভাবে, এসব তথ্য বাংলাদেশ আইনের অধীনে দুর্নীতিতে সহায়তা ও প্ররোচনায় টিউলিপ সিদ্দিকের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে। এই বাস্তবতা ও পরিস্থিতির আলোকে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে তিনি জড়িত নন—এমন দাবির কোনো ভিত্তি নেই।
কে