দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে প্রস্তাবিত কাঠামোয় সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হবে এবং সরকারের জন্যও আত্মঘাতী হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে নাগরিক সমাজের ১৯টি সংগঠন ও সম্প্রতি গঠিত গণমাধ্যম কমিটির মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেছে। ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে অপতথ্য ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার পেছনে এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফাকেন্দ্রিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বার্থে মেটা সংঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্য বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ ও যৌক্তিক আলোচনার বিষয়বস্তু সেন্সর করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রযুক্তি ব্যবসার অশুভ আঁতাতের কারণে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর কঠোর আইন চাপিয়ে দেওয়া টেকসই সমাধান নয়।
সভায় ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধপল্লিতে হামলা ও ২৫টি প্যাগোডা ভাঙচুর, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের গণহত্যাকে উসকে দেওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে জনতাকে উসকে দিয়ে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনায় ফেসবুকের অপব্যবহার হয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা কঠিন হচ্ছে। তিনি প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেওয়া, ২৫ ধারায় মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার রোধ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্যের কথা তুলে ধরেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবারদের মাধ্যমে চরিত্রহনন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দিয়ে শফিকুল আলম বলেন, মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় না রেখে দেওয়ানি আইনের অধীনে আনা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কারও সম্মানহানি করলে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার বিধান রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রস্তাবিত আইনে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আইনটি দেখে মনে হচ্ছে, এটি ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এতে গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত আইনে একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের কারণে পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার মতো বিধান রয়েছে। এ ছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি জব্দ করার ক্ষমতা পেতে পারেন। এতে একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। মানহানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
তৃণমূল পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি।
সভায় রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরীফুজ্জামান পিন্টু প্রস্তাবিত আইনের দায়মুক্তির বিধান, অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লকের প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সাংবাদিকতা ও মূলধারার গণমাধ্যম যাতে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রাখার দাবি জানান তিনি।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রস্তাবিত গঠনকাঠামো নিয়েও আপত্তি জানান শরীফুজ্জামান পিন্টু। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান করে মন্ত্রী, সচিব ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য নেই। নির্বাহী বিভাগকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য শুভ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কাউন্সিলে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সদস্য হিসেবে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান শরীফুজ্জামান পিন্টু।
সমাপনী বক্তব্যে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষার প্রশ্নে নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম একই অবস্থানে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য জরুরি। তিনি প্রস্তাবিত আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে আইনটি সংশোধনের আহ্বান জানান।
এমএম/