দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৪৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া কর্মস্থল থেকে পলায়নের অভিযোগে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩১ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদসহ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত বা পলাতক থাকার অভিযোগে এএসপি ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ৫৭ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়েছে। এসব মামলায় ২৮ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং একজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা, আদালতে দায়ের করা অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেপ্তার ২৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার দুজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এর ২০২৫ সালের চারটি মামলার রায়ের ভিত্তিতে এএসপি ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দণ্ডিত পাঁচ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাকি আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।
গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার পাঁচ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণ করা হয়েছে। আরও ৩০ পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার ৭৩ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট অন্য পুলিশ পরিদর্শকদের বিরুদ্ধেও চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এর আগে গত ১৩ আগস্ট সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকা পালনকারী এবং শাস্তিপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বৈঠকে পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কমিটির সদস্য শিরীন সুলতানা। তিনি জানতে চান, গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকা পালনকারী কিংবা শাস্তিপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা কীভাবে নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশের থানায় আবার পদায়ন পাচ্ছেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
কমিটির আরেক সদস্য মনোয়ার হোসেন বলেন, গুম কমিশনের প্রতিবেদনে নাম আসা এবং বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া অনেক কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন পদে বহাল রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
বৈঠকে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেন বলেন, ওই সময় পুলিশের অবকাঠামো ও যানবাহনের ক্ষতির পাশাপাশি সদস্যদের মনোবল ও মানসিক অবস্থার ওপরও বড় প্রভাব পড়েছে। পুলিশ সদস্যদের মনোবল ফেরাতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রয়েছে কি না, তা জানতে চান তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, পুলিশের মনোবল বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সংঘবদ্ধ জনতার কারণে পুলিশকে দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন বাধা ও বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে। থানায় পুলিশ কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যানও উপস্থাপন করা হয়। এতে ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র আইন ও বিস্ফোরক দ্রব্য-সংক্রান্ত মামলার তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আগের তুলনায় উন্নতির চিত্র তুলে ধরা হলে কমিটির সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা করে কমিটি।
এমএম/