দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর লেখা ঐতিহাসিক একটি ডায়েরির ছবিও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তকে নতুন অধ্যায় হিসেবে নিবন্ধটি স্থান পাচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম স্মৃতিকথা হিসেবে আলোচিত এই দলিলটি পাঠ্যভুক্ত করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি)।
বিষয়টি নিশ্চিত করে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, ‘আগামী বছরের শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এনসিসিসি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।’
শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঠ্যবইয়ে নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির ফলে শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম থেকে ভেসে আসা ঐতিহাসিক ‘উই রিভোল্ট’ এবং কালুরঘাটের স্বাধীনতার ঘোষণার স্মৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের লেখা এই নিবন্ধে ঐতিহাসিক মূল্য আছে। এর মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে। পাঠ্যবইয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত করা যৌক্তিক।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বলেন, ‘এই নিবন্ধ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ ঘটনা জানার সুযোগ পাবে। অতীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে যেভাবে একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চা করা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নির্মোহ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরার দৃষ্টিভঙ্গি সেই মানসিকতার অবসান ঘটাবে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে সচিবের সভাপতিত্বে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এনসিটিবির কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা জানান, নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তকের ২২ নম্বর গদ্যের লেখক পরিচিতি অংশে জিয়াউর রহমানকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও ‘বীর উত্তম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক ‘জনযুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ২৫ মার্চের গণহত্যার পর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হলে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের জন্য ‘তুর্যধ্বনির মতো’ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনসিটিবি জানায়, প্রবন্ধটির মূল বর্ণনা শুরুর আগে কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ১৯৭২ সালে ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ এবং ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ দুটিকে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব নয়। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অনিবার্য নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, গদ্যের প্রবন্ধে ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সম্মুখসমরের আত্মত্যাগের বর্ণনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র দায়িত্ব গ্রহণের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘সবাই আমরা যুদ্ধ করেছি। সৈনিক, জনগণ সবাই। জাতির চরম সংকটের মুহূর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে আসতে হয়। নিতে হয় দায়িত্ব। আমি কেবল সেই দায়িত্ব পালন করেছি। নেতারা যখন উধাও হয়ে গেল, সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ থাকল না, তখন জাতির পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হলো... ২৬শে মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে সেই চূড়ান্ত সময়টি এলো। যার জন্য গোটা মাস আমরা রুদ্ধশ্বাস হয়ে প্রতীক্ষা করছিলাম।’
চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘১লা মার্চ থেকে ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের রহস্যজনক গতিবিধি থেকে আমরা সুস্পষ্ট আঁচ করতে পারছিলাম কী ঘটতে যাচ্ছে... ১৩ই মার্চ নেতাদের সঙ্গে ইয়াহিয়ার গোলটেবিল বৈঠক শুরু হলো। এর মধ্যেই পাকিস্তানি জেনারেলরা একের পর এক বিমানে আসতে লাগলেন... এ ছিল সর্বাত্মক হামলার এক ভীতিকর পূর্বাভাস।’
নিবন্ধে তিনি আরও লিখেছেন, ‘আগ্রাবাদের এক ব্যারিকেডের সামনে ট্রাক থেমে গেল... ঠিক সে সময়ে মেজর খালিকুজ্জামান সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। অনুচ্চস্বরে বললেন, ওরা ক্যান্টনমেন্টে হামলা শুরু করেছে। শহরেও অভিযান চালিয়েছে। হতাহত হয়েছে বহু নিরীহ মানুষ। যে সময়ের জন্য এতদিন অপেক্ষা করছিলাম, সে সময় এসে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম, ‘উই রিভোল্ট’। নির্দেশ দিলাম, ষোলশহরে ছুটে যাও। পাকিস্তানি অফিসারদের আটক করো। যুদ্ধের জন্য তৈরি করে রাখো ব্যাটালিয়নের সবাইকে।’
ষোলশহরে যাওয়ার পরের ঘটনা বর্ণনা করে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘সিভিল টেলিফোন সার্ভিসের একজন অপারেটরকে টেলিফোনে পেলাম। তাকে বললাম: ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, এ সংবাদটি যেন সে চট্টগ্রামের ডিসি, কমিশনার, পুলিশের ডিআইজি আর রাজনৈতিক নেতাদের জানিয়ে দেয়।’
তিনি আরও লেখেন, ‘সেই মুহূর্তটি ছিল জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ব্যাটালিয়নের সব অফিসার আর জোয়ানদের এক জায়গায় একত্র করে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলাম। বললাম, আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে নেমেছি। তারা এই ঘোষণাটির জন্যই উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই উল্লাসধ্বনি করে সাড়া দিল। পর মুহূর্তেই সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রাত তখন ২টা ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ ১৯৭১। জাতির জন্যে অবিস্মরণীয় সেই মুহূর্তটি।’
পটিয়ার পাহাড়ে প্রথম মুক্তাঞ্চল গঠন ও সামরিক কৌশলের বর্ণনা দিয়ে তিনি লেখেন, ‘রাত ৪টায় রেললাইন ধরে পটিয়ার পাহাড়ের দিকে যাত্রা করলাম। পথে ইপিআরের একশজন আমাদের সঙ্গে যোগ দিল... ২৬শে মার্চের মধ্যেই তিনশ সদস্যের বাহিনীকে চট্টগ্রাম পাঠানো হলো হানাদারের মোকাবিলার জন্য। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সেই প্রথম সম্মুখসমর, পাকিস্তানি শিবিরে তখন আতঙ্ক। তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো।’
কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার স্মৃতিচারণ করে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘দিনটি ছিল ২৭শে মার্চ... সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রেডিও স্টেশনে এলাম। হাতের কাছে একটি এক্সারসাইজ খাতা পাওয়া গেল। তার একটি পৃষ্ঠায় দ্রুতহাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার কথা লিখলাম... বেতার তরঙ্গের সে ঘোষণা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রেডিওতে ধরা পড়ল। আর বিশ্ববাসী সেই প্রথম শুনলো: বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঘোষণা নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে... ২৭শে মার্চ, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ইথারে ঘোষণাটি উচ্চারিত হওয়ার পর মুহূর্তেই বিশ্বমানচিত্রে অঙ্কিত হয়ে গেল ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ কথাটি।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, ‘এনসিসিসি সভায় নিবন্ধটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও নির্মোহ ইতিহাস জানতে পারবে।’
সুত্র-বাসস
এমএম/