দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার গ্রেডভেদে নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিদ্যমান বেতন কাঠামোর মতো সবার জন্য ৫ শতাংশ অভিন্ন ইনক্রিমেন্ট না রেখে উচ্চতর গ্রেডে ধাপে ধাপে এ হার কমানো হবে। ফলে গ্রেড যত উচ্চ হবে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হারও তত কম হবে।
অন্যদিকে, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোতে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কারণে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়িভাড়া ভাতার হার কিছুটা কমানো হচ্ছে। তবে মূল বেতন বাড়ায় গ্রেডভেদে বাড়িভাড়া ভাতার টাকার পরিমাণ বাড়বে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। ওই সভার কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বর্তমানে সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীরা বিদ্যমান বেতন স্কেল অনুযায়ী বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন পে স্কেলে এই অভিন্ন হারের বদলে গ্রেডভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন ইনক্রিমেন্ট হার চালু করা হচ্ছে।
নতুন বেতন কাঠামোতে ২০তম গ্রেড থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে কর্মরতদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর ওপরের গ্রেডগুলোতে এ হার পর্যায়ক্রমে কমানো হবে। ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ইনক্রিমেন্ট হবে ৪ শতাংশ। ৪র্থ ও ৩য় গ্রেডভুক্তদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হবে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২য় গ্রেডে কর্মরতরা পাবেন ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট।
একই নীতি প্রযোজ্য হবে সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদবিতে কর্মরতদের ইনক্রিমেন্টের হার হবে ৫ শতাংশ। মেজর পদের জন্য ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেলদের জন্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদের ক্ষেত্রে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার হবে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনা, যা প্রথমে ৫ শতাংশ এবং পরে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করা হবে।
১৯৭৩ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার মোট আটটি পে স্কেল বাস্তবায়ন করেছে। সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছর পরপর নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে ২০১৫ সালে বিদ্যমান বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় সবার জন্য ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার বিধান চালু করে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে আর কোনো পে কমিশন গঠনের প্রয়োজন হবে না।
তখন বলা হয়েছিল, কোনো বছর মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের বেশি হলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে ইনক্রিমেন্ট বাড়ানো হবে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় তা কখনো কার্যকর করেনি।
২০১৫ সালের বিদ্যমান পে স্কেল অনুযায়ী, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরা গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা পান। নতুন পে স্কেলে এই হার কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মূল বেতনের তুলনায় বাড়িভাড়ার হার কমলেও গ্রেডভেদে মূল বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি বাড়ায় বাড়িভাড়া ভাতার টাকার পরিমাণও বাড়বে।
বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন ছাড়া দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকা ও সাভার উপজেলার জন্য গ্রেডভেদে বাড়িভাড়ার হার মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ। নতুন বেতন স্কেলে এসব এলাকায় কর্মরতরা বাড়িভাড়া ভাতা হিসেবে মূল বেতনের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পাবেন।
একইভাবে, নতুন বেতন কাঠামোতে ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলার বাইরে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেডভেদে বাড়িভাড়ার হার হবে মূল বেতনের ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ। বর্তমানে এ হার ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ।
উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিদ্যমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী, কোনো চাকরিজীবী একই বেতন গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেডে বেতন পান। নতুন বেতন কাঠামোতে এ সময় দুই বছর কমিয়ে আট বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পদোন্নতি ছাড়া দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে আগের মতোই ছয় বছর একই গ্রেডে চাকরির শর্ত বহাল রাখা হয়েছে।
পদোন্নতিযোগ্য কোনো পদে কর্মরতদের ক্ষেত্রে পদোন্নতি ছাড়া এভাবে উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সুযোগ চাকরিজীবনে দুইবারের বেশি থাকবে না। অর্থাৎ, যেসব পদ থেকে পদোন্নতির সুযোগ থাকলেও কেউ পদোন্নতি না পান, অবসরে যাওয়ার আগে তিনি মোট দুটি উচ্চতর গ্রেডে পৌঁছাতে পারবেন।
তবে যেসব পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতির কোনো বিধান নেই এবং ব্লকড পদ হিসেবে ঘোষিত, ওইসব পদে কর্মরতরা পুরো চাকরিজীবনে মোট তিনবার উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হতে পারবেন। এর মধ্যে প্রথম আট বছর চাকরির পর একবার, পরবর্তী ছয় বছর চাকরির পর দ্বিতীয়বার এবং তার পরবর্তী আট বছর চাকরির পর তৃতীয়বার উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমান বেতন কাঠামোতে সব কর্মচারীর জন্য মাসিক চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনারদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা ২ হাজার ৫০০ টাকা।
নতুন বেতন কাঠামোতে গ্রেড নির্বিশেষে ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী চাকরিজীবীদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। যাদের বয়স ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত, তারা মাসে ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন। অন্যদিকে, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী পেনশনভোগীরা মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীরা ৬ হাজার টাকা করে পাবেন।
নতুন পে স্কেলে প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ফোন ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ১ম থেকে ৩য় গ্রেডের কর্মকর্তারা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪র্থ ও ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১ হাজার টাকা মোবাইল ফোন বিল পান। অন্যান্য গ্রেডের কেউ মোবাইল ফোন বিল পান না।
নতুন বেতন কাঠামোতে ১ম থেকে ৫ম গ্রেডভুক্তদের মাসিক মোবাইল ভাতা কমিয়ে ৫০০ টাকা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডভুক্তদের জন্য মাসে ১৫০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নতুন বেতন কাঠামোতে যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা ও ধোলাই ভাতা দ্বিগুণ বা তার বেশি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান পে স্কেলে যাতায়াত ভাতা মাসে ৩০০ টাকা, নতুন স্কেলে তা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হচ্ছে। টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হচ্ছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা বাংলা নববর্ষ ভাতা হিসেবে বিদ্যমান মূল বেতনের ২০ শতাংশ পান। নতুন কাঠামোতে এটি কমিয়ে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের জন্য পাহাড়ি ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। তবে পার্বত্য জেলা ও উপজেলা সদরের জন্য এর সর্বোচ্চ সীমা হবে ৫ হাজার টাকা এবং সদরের বাইরের এলাকার জন্য ৫ হাজার ৫০০ টাকা।
হাওর, দ্বীপ ও চর ভাতা হিসেবেও মূল বেতনের ২০ শতাংশ হার অপরিবর্তিত রেখে সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটিজ এলাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি বিনোদন ছুটি ও ভাতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান হার ও পরিমাণ বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদস্যদের জন্য মূল বেতনের ৪০ শতাংশ হারে ঝুঁকি ভাতা চালু করেছিল সরকার। পরে তা অন্যান্য সংস্থাতেও সম্প্রসারিত হয়।
২০১৫ সালের বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় তার আগের বেতন কাঠামো অনুযায়ী পদভিত্তিক যে পরিমাণ ঝুঁকি ভাতা দেওয়া হতো, তা বহাল রাখা হয়। গেজেটেও উল্লেখ ছিল, মূল বেতনের অনুপাতে ঝুঁকি ভাতা দেওয়া হবে না।
এবার নতুন বেতন কাঠামোতে ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষ ভাতার পরিমাণ বিদ্যমান ভাতার ওপর ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতাও শতকরা হারে না দিয়ে টাকার অঙ্কে নির্ধারিত আছে। নতুন বেতন কাঠামোতে এটি মূল বেতনের ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এমএম/