দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যত্রতত্র বজ্রপাতে জীবনহানির ঘটনা ঘটছে। আকাশে বিজলী চমকালেই প্রাণনাশের ভয়ে মানুষ অত্যন্ত বিচলিত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটাছুটি করছে। এটা যে শুধু মানুষের উপরই পড়ছে তা নয়, গরু, মহিষ, গাছপালা প্রভৃতির উপর পতিত হয়ে ঝলসে দিচ্ছে। অতীতে বিভীষিকাময় এই বজ্রপাতের ঘটনা খুব কমই শুনা যেত। বর্তমানে এর মাত্রা ক্রমশ বেড়েই চলছে এবং নিমিষেই ঘটছে প্রাণহানি।
আবহাওয়াবিদ ও বিজ্ঞানীরা এর কারণ হিসাবে বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা, বিভিন্ন কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও গ্যাসকে দায়ী করছেন। কেউ কেউ বনজঙ্গল, বড় বড় গাছপালা নিধন ও তাল গাছের স্বল্পতাকে দায়ী করেছেন। আবহাওয়াবিদগণ বলছেন, মূলত বৈরী আবহাওয়ার কারণেই এসব ঘটে থাকে।
বজ্রপাত কি?
বজ্রপাত হ’ল আকাশে আলোর ঝলকানি বিশেষ। এ সময় বজ্রপাত সংঘটিত এলাকায় মাসে কয়েক লাখ ভোল্টের কারেন্ট উৎপন্ন করে যার তাপ ৩০ হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার সমপরিমাণ। এখানে বুঝার সুবিধার জন্য বলা যেতে পারে ৩০ হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা যা সূর্যের পাঁচগুণ বেশী। এ সময় বাতাসের প্রসারণ এবং সংকোচনের ফলে বিকট শব্দ সৃষ্টি হয়। বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক আগুনের নির্গমন দু’টি মেঘের মধ্যে অথবা একটি মেঘ এবং ভূমির মধ্যেও সংঘটিত হ’তে পারে। বজ্রপাতের সময় সেখানে ডিসি কারেন্ট উৎপন্ন হয়।
কিভাবে বজ্রপাত সৃষ্টি হয়?
বছরের বিভিন্ন সময় পত্র-প্রত্রিকা ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে মৃত্যুর কথা শোনা যায়। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ আমাদের দেশে বজ্রপাতে মারা যায়। এবার আমরা জানার চেষ্টা করব, কেন ও কিভাবে বজ্রপাত সৃষ্টি হয়। বায়ুমন্ডলের উপরের অংশের তাপমাত্রা নীচের অংশের তুলনায় কম থাকে। এই কারণে অনেক সময় দেখা যায়, নীচের দিক থেকে তুলনামূলক হালকা মেঘ উপরের দিকে প্রবাহিত হয়। উপরের দিকে উঠতে থাকা এ ধরনের মেঘকে থান্ডার ক্লাউড বলা হয়।
অন্যান্য মেঘের মত এ মেঘেও ছোট ছোট পানির কণা বা অতি ক্ষুদ্র জলীয়বাষ্প থাকে। এভাবে উপরে উঠতে উঠতে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অর্থাৎ এ ধরনের মেঘে পানির ঘনত্ব বাড়তে থাকে। এভাবে বৃদ্ধি পেতে পেতে পানির পরিমাণ এক সময় ৫ মিঃমিঃ এর বেশী হয়, তখন পানির অণুগুলো আর পারস্পরিক বন্ধন ধরে রাখতে পারে না। তখন এরা আলাদা- হয়ে যায়, ফলে সেখানে বৈদ্যুতিক আধানের বা চার্জ সৃষ্টি হয়। আর এভাবে সৃষ্ট আধানের মান নীচের অংশের চেয়ে উপরে বেশী হয়। অর্থাৎ বিভব পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। এই কারণেই উপর হ’তে নীচের দিকে বৈদ্যুতিক আধানের বা চার্জের নির্গমন হয়। বৈদ্যুতিক আধানের বা চার্জের আকস্মিক স্থানান্তরের কারণে এ সময় আমরা আলোর ঝলকানি দেখতে পাই। আর ঘটনার সময় উক্ত এলাকায় বাতাসের প্রসারণ এবং সংকোচন (Contraction) ঘটে। ফলে আমরা বিকট শব্দ শুনতে পাই। এ ধরনের বৈদ্যুতিক আধানের স্থানান্তর দু’টি মেঘের মধ্যে অথবা একটি মেঘ এবং ভূমির মধ্যেও হতে পারে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায়:
বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে খোলা বা উঁচু জমিতে না থাকা। কোন ভবনের নিচে আশ্রয় নেওয়া ভাল হবে।
উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। তাই বজ্রঝড়ের সময় গাছ বা খুঁটির কাছাকাছি থাকা নিরাপদ নয়। এমনকি খালি তাঁবু বা বড় গাছগুলোতে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। তাই সেখানে আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
বাড়িতে থাকাবস্থায় জানালা দিয়ে উঁকি দেওয়া যাবে না। আবহাওয়া অধিদফতর এই সময় জানালা বন্ধ রাখার এবং ঘরের মধ্যে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
যখন বজ্রঝড় বা ঝড় হয়, তখন বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা ঠিক নয়। এমনকি ল্যান্ড ফোন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ যখন তার বজ্রপাতের সংস্পর্শে আসে, তখন অনেকগুলিই স্পৃষ্ট হতে পারে।
এই সময়ে সব ধরনের বৈদ্যুতিকভাবে সংযুক্ত যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ থাকলেও তাদের স্পর্শ করা ঠিক হবে না। আর বজ্রপাতের ক্ষেত্রে সুইচ বা প্লাগ আগে থেকেই খোলা রাখতে হবে।
কেউ বজ্রঝড়ের সময় রাস্তায় গাড়িতে থাকলে আবহাওয়াবিদের মতে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফেরার চেষ্টা করতে হবে। তারপর যদি প্রবল বজ্রপাত এবং বৃষ্টি হয়, তাহলে গাড়িটি কোন পাকা ভবনের নীচে রাখা যেতে পারে। সেই সময় গাড়ির কাচ স্পর্শ করাও বিপদের কারণ হতে পারে।
ভারী বৃষ্টির কারণে রাস্তায় পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে এবং অনেক সময় বৃষ্টির মধ্যে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে তার পানিতে পড়ে যেতে পারে, যা দুর্ঘটনার কারণ। আবার কাছাকাছি কোথাও বজ্রপাত হলেও, সেই পানি বৈদ্যুতিক শক হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
ভেজা চামড়ার জুতা বা খালি পা খুব বিপজ্জনক, বিশেষ করে বজ্রপাতের সময়। এ সময় একা বাইরে যেতে হ’লে পা-ঢাকা জুতা ব্যবহার করা ভাল এবং রাবার গামবুট এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো কাজ করবে।
স্বেচ্ছাসেবকদের উচিত আহতদের চিকিৎসার জন্য খুব তাড়াতাড়ি তাদের হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করা। খালি হাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া কাউকে স্পর্শ করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই খালি হাতে স্পর্শ করা উচিত নয়, তবে কিছু সময় পর স্পর্শ করা যাবে।
নদী, পুকুর বা হরদে মাছ ধরা বা নৌকা ভ্রমণ যে কোন উপায়ে এড়ানো উচিত। যদি একসাথে অনেক লোক থাকে তবে সেগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উচিত। বজ্রপাতের সময় কংক্রিটের উপর ঝুঁকে যাওয়া বা দেয়ালের সাথে ঝুঁকে যাওয়া এড়ানো উচিত।
সমতল খোলা মাঠে প্রয়োজনে উচ্চতা এড়ানো উচিত। শক্ত কাঠামো ইস্পাত বা লোহার কাঠামোর কাছে দাঁড়ানো যাবে না। বিশেষ করে, যে কোন বড় বিচ্ছিন্ন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা থেকে বিরত থাকা উচিত। খোলা মাঠে আশ্রয় নিলেও সেখানে শুয়ে থাকা ঠিক হবে না।
কেএম/জে আই