দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দীর্ঘক্ষণ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার পর চোখে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব কিংবা ঝাপসা দেখার সমস্যা হচ্ছে? কারও চোখ দিয়ে পানি পড়ে, আবার কারও চোখে দেখা দেয় শুষ্কতা ও খসখসে অনুভূতি। একটানা ফোন ব্যবহার করলে এসব অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের সমস্যাকে সাধারণত ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বা স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে চোখের ক্লান্তি বলা হয়। দীর্ঘক্ষণ কাছের বস্তুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা এবং স্ক্রিন দেখার সময় চোখের পলক কম পড়া এর অন্যতম কারণ। তবে চোখে জ্বালাপোড়া হলেই যে স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে, এমন নয়। আবার সব ক্ষেত্রে ফোন ব্যবহারই সমস্যার একমাত্র কারণ নয়।
ফোন ব্যবহারে চোখে জ্বালাপোড়া হয় কেন?
স্মার্টফোনে পড়া, ভিডিও দেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করার সময় অনেকেই দীর্ঘক্ষণ একই দূরত্বে তাকিয়ে থাকেন। এতে চোখের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি স্ক্রিন দেখার সময় স্বাভাবিকের তুলনায় চোখের পলক কম পড়ে। ফলে চোখের আর্দ্রতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়।
চোখের উপরিভাগে অশ্রুর একটি পাতলা স্তর থাকে, যা চোখকে আর্দ্র ও সুরক্ষিত রাখে। প্রতিবার চোখের পলক ফেললে এই স্তরটি চোখের উপরিভাগে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পলক কম পড়লে অশ্রুর স্তর দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে। এর ফলে চোখে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি দেখা দেয়।
ডিজিটাল আই স্ট্রেইনের কারণে চোখের ক্লান্তি, ঝাপসা দৃষ্টি, মাথাব্যথা এবং কাছের বস্তুতে দৃষ্টি স্থির রাখতে অসুবিধাও হতে পারে। এ ছাড়া কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার, শুষ্ক পরিবেশ, ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বাতাস এবং আগে থেকে থাকা চোখের সমস্যাও এসব উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে।
২০২২ সালে Ophthalmology and Therapy সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ডিজিটাল আই স্ট্রেইনের সাধারণ উপসর্গ হিসেবে চোখের শুষ্কতা, পানি পড়া, ঝাপসা দৃষ্টি ও মাথাব্যথার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চোখের পলক স্বাভাবিকভাবে ফেলা এবং নিয়মিত বিরতি নেওয়াকে অস্বস্তি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
চোখের জ্বালাপোড়ার জন্য কি ব্লু লাইট দায়ী?
স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো বা ব্লু লাইটকে অনেক সময় চোখের ক্লান্তির প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে ব্লু-লাইট ফিল্টারযুক্ত চশমার ব্যবহারও জনপ্রিয় হয়েছে। তবে এ ধরনের চশমা ডিজিটাল আই স্ট্রেইন কমাতে কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে শক্তিশালী প্রমাণ নেই।
কোচরেনের একটি পর্যালোচনায় ৬১৯ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা ১৭টি গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, সাধারণ লেন্সের তুলনায় ব্লু-লাইট ফিল্টারযুক্ত লেন্স স্বল্পমেয়াদে চোখের ক্লান্তি কমাতে উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেয়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাই শুধু ব্লু লাইটকে দায়ী না করে স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। চোখের পলক কম পড়া, দীর্ঘক্ষণ কাছের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং বিরতি না নেওয়া অস্বস্তির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
চোখের জ্বালাপোড়া কমানোর ৮টি উপায়
১. মেনে চলুন ২০-২০-২০ নিয়ম
প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান। এতে একটানা কাছের দিকে তাকিয়ে থাকার চাপ কমাতে সাহায্য হতে পারে।
২. সচেতনভাবে চোখের পলক ফেলুন
ফোনে পড়া বা স্ক্রল করার সময় ধীরে ধীরে ও পুরোপুরি পলক ফেলার চেষ্টা করুন। এতে চোখের উপরিভাগে অশ্রুর স্তর ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।
৩. চোখ থেকে উপযুক্ত দূরত্বে ফোন রাখুন
সাধারণভাবে চোখ থেকে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার দূরে ফোন রেখে ব্যবহার করতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী দূরত্ব সামঞ্জস্য করুন, যাতে স্ক্রিন দেখতে চোখ কুঁচকে রাখতে না হয়।
৪. ছোট অক্ষরের পরিবর্তে বড় ফন্ট ব্যবহার করুন
ছোট লেখা পড়তে গিয়ে চোখ কুঁচকে দেখার পরিবর্তে ফোনের সেটিংস থেকে লেখার আকার বাড়িয়ে নিন। এতে পড়তে সুবিধা হবে এবং চোখের অস্বস্তি কমতে পারে।
৫. স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা ঠিক রাখুন
ঘরের আলো ও আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা সামঞ্জস্য করুন। স্ক্রিনে জানালা বা বাতির প্রতিফলন পড়লে ফোনের অবস্থান পরিবর্তন করুন।
৬. দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহার থেকে বিরতি নিন
একটানা ভিডিও দেখা বা স্ক্রল করার পরিবর্তে মাঝে মাঝে ফোন সরিয়ে রাখুন। বিরতির সময় দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান এবং সম্ভব হলে কিছুক্ষণ স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ বিরতি নিন।
৭. চোখে সরাসরি বাতাস লাগতে দেবেন না
ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বাতাস সরাসরি চোখে লাগলে শুষ্কতা বাড়তে পারে। তাই বাতাসের দিক পরিবর্তন করুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবেশের আর্দ্রতা বজায় রাখুন।
৮. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখুন। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করুন। এতে ঘুমের ব্যাঘাত কমাতে সাহায্য হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
অভ্যাস পরিবর্তনের পরও চোখে শুষ্কতা বা জ্বালাপোড়া থাকলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে লুব্রিকেটিং আই ড্রপ বা কৃত্রিম অশ্রু ব্যবহার করা যেতে পারে।
চোখের লালচে ভাব দূর করার জন্য তৈরি কিছু ড্রপ নিয়মিত ব্যবহার করলে সমস্যার মূল কারণ দূর নাও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ড্রপ ঘন ঘন ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিশেষ সতর্কতা: চোখে তীব্র ব্যথা, হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া, আলো সহ্য করতে অসুবিধা কিংবা চোখ খুব লাল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
স্মার্টফোন দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও একটানা স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস চোখে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত বিরতি, উপযুক্ত দূরত্ব, সঠিক আলো এবং চোখের যত্নের অভ্যাস বজায় রাখাই চোখের সুস্থতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
কেএম