দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সমুদ্রের গভীরে বসানো বিশাল কংক্রিটের ফাঁপা গোলক দেখতে যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির কোনো স্থাপনা। তবে এটিই হতে পারে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত।
২০২৬ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লং বিচ উপকূলের কাছে সমুদ্রপৃষ্ঠের কয়েকশ মিটার গভীরে বসানো হতে যাচ্ছে এমনই একটি ৪০০ টন ওজনের কংক্রিট গোলক, যা কাজ করবে এক ধরনের ব্যাটারি হিসেবে।
এই প্রযুক্তির নাম “স্টেনসি”। পূর্ণরূপ ‘স্টোরড এনার্জি ইন দ্য সি’। এটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছে জার্মানির ফ্রাউনহোফার ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড এনার্জি সিস্টেম টেকনোলজি।
প্রযুক্তিটির বিশেষত্ব হলো, এতে লিথিয়াম বা কোনো রাসায়নিক সেল ব্যবহার করা হয় না। আগুন লাগার ঝুঁকিও নেই। পুরো ব্যবস্থাটি কাজ করে পানি, চাপ এবং পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ নীতির মাধ্যমে।
কীভাবে কাজ করবে
সমুদ্রের তলদেশে বসানো ফাঁপা গোলকের ভেতরে থাকবে পাম্প ও টার্বাইন। যখন অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ুশক্তি উৎপন্ন হবে, তখন সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গোলকের ভেতরের পানি বাইরে বের করে দেওয়া হবে। এতে গোলকের ভেতরে শূন্যতার মতো অবস্থা তৈরি হবে, যাকে গবেষকরা ‘চার্জড’ অবস্থা বলছেন।
পরে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে গোলকের ভালভ খুলে দেওয়া হবে। গভীর সমুদ্রের প্রচণ্ড চাপে পানি দ্রুত গোলকের ভেতরে ঢুকবে এবং সেই প্রবাহে টার্বাইন ঘুরে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমুদ্রের গভীরতা যত বাড়ে, পানির চাপও তত বৃদ্ধি পায়। প্রতি ১০ মিটার গভীরতায় প্রায় ১ বার চাপ বাড়ে। স্টেনসি প্রকল্প সেই প্রাকৃতিক চাপকেই শক্তি সংরক্ষণের উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তির ব্যবহার। কিন্তু এই দুই শক্তির প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, সূর্য সবসময় আলো দেয় না এবং বাতাসও সবসময় সমানভাবে প্রবাহিত হয় না।
ফলে দিনের বেলায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হলেও সন্ধ্যায় চাহিদা বেড়ে গেলে ঘাটতি তৈরি হয়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘ডাক কার্ভ’।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সফল ব্যবহারের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কার্যকর শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
পুরোনো ধারণার নতুন রূপ
পানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ধারণা নতুন নয়। বহু বছর ধরে ‘পাম্পড হাইড্রো স্টোরেজ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দিয়ে পানি উঁচু জলাধারে তুলে রাখা হয় এবং পরে সেই পানি নিচে নামিয়ে টার্বাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
তবে প্রচলিত এই ব্যবস্থার জন্য পাহাড়, বড় বাঁধ এবং বিপুল জমির প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে স্থানচ্যুতও হতে হয়।
এই সীমাবদ্ধতার কারণেই জার্মান গবেষকদের মাথায় আসে নতুন ধারণা—পাহাড়ের বদলে সমুদ্রের গভীরতাকে ব্যবহার করা যায় কি না।
এক অদ্ভুত ভাবনা থেকে যাত্রা
২০১১ সালে গ্যোটে ইউনিভার্সিটি ফ্রাংকফুর্টের পদার্থবিদ Horst Schmidt-Böcking এবং জারল্যান্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক Gerhard Luther এই ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন।
তাদের ভাবনা ছিল, পাহাড়ি জলবিদ্যুতে পানি ওপর থেকে নিচে নামে, কিন্তু সমুদ্রে তো সবসময়ই বিপুল চাপ নিচের দিকে কাজ করে। সেই চাপকে কাজে লাগিয়ে যদি শক্তি সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে নতুন ধরনের ব্যাটারি তৈরি সম্ভব।
সেখান থেকেই জন্ম নেয় স্টেনসি প্রকল্প।
পরীক্ষায় সফলতা
২০১৬ সালের নভেম্বরে জার্মানির Lake Constance হ্রদে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে একটি ছোট কংক্রিট গোলক নামানো হয়। গোলকটির ব্যাস ছিল ৩ মিটার এবং সেটি প্রায় ১০০ মিটার গভীরে স্থাপন করা হয়।
গবেষকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল, অতিরিক্ত চাপে গোলকটি ভেঙে যেতে পারে কি না। তবে পরীক্ষায় কাঠামোটি সফলভাবে কাজ করে।
গবেষকরা আরও জানান, পুরো গোলক ওপরে না তুলেও ভেতরের যন্ত্রাংশ আলাদা করে মেরামত করা সম্ভব হয়েছে।
এবার ক্যালিফোর্নিয়ায় বড় পরীক্ষা
বর্তমানে যে প্রোটোটাইপটি তৈরি করা হচ্ছে, তার ব্যাস হবে ৯ মিটার। ওজন প্রায় ৪০০ টন। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার Long Beach উপকূলের কাছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ মিটার গভীরে বসানো হবে।
গোলক তৈরির কাজ করছে Sperra, যারা থ্রিডি কংক্রিট প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আর পাম্প-টার্বাইন তৈরি করছে Pleuger Industries।
প্রাথমিক এই মডেলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে প্রায় ০ দশমিক ৫ মেগাওয়াট, যা কয়েকশ থেকে প্রায় এক হাজার সাধারণ বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে।
গবেষকদের মতে, এটি মূলত একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প। এর লক্ষ্য হলো, বাস্তব সমুদ্র পরিবেশে প্রযুক্তিটি কার্যকর কি না তা যাচাই করা।
তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো ৩০ মিটার ব্যাসের বিশাল গোলক তৈরি করা, যা কার্যত ছোট আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
লিথিয়াম ব্যাটারির বিকল্প?
বর্তমানে শক্তি সংরক্ষণে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। তবে লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেল উত্তোলনের কারণে পরিবেশগত ক্ষতি এবং মানবাধিকার নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বড় ব্যাটারিতে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটছে।
স্টেনসি প্রকল্পের গবেষকদের দাবি, কংক্রিট ও পানি-ভিত্তিক এই প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং দীর্ঘস্থায়ী। একটি গোলক ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে স্বল্পমেয়াদি দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহে লিথিয়াম ব্যাটারি এবং দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ শক্তি সংরক্ষণে স্টেনসির মতো প্রযুক্তি একসঙ্গে ব্যবহৃত হতে পারে।
শুধু সমুদ্রেই নয়
গবেষকরা বলছেন, এই প্রযুক্তি শুধু সমুদ্রে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে গভীর হ্রদ, পরিত্যক্ত কয়লাখনি বা পুরোনো জলাধারেও একই ধারণা ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিশেষ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়লাখনিগুলোকে নবায়নযোগ্য শক্তি সংরক্ষণের অবকাঠামোতে রূপান্তর করার সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
ফ্রাউনহোফার ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের উপকূলীয় অঞ্চলে এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য মোট সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় ৮ লাখ ১৭ হাজার গিগাওয়াট-ঘণ্টা।
ভবিষ্যতের শক্তি নেটওয়ার্ক
কিছু বিজ্ঞানী এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা করছেন, যেখানে অফশোর উইন্ড ফার্মের নিচে হাজার হাজার কংক্রিট গোলক বসানো থাকবে। সমুদ্রের নিচে গড়ে উঠবে বিশাল শক্তি সংরক্ষণ নেটওয়ার্ক।
সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ধারণ করবে কোন গোলক কখন চার্জ হবে বা বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সমুদ্র হয়তো শুধু পানির আধার নয়, বরং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘পাওয়ার ব্যাংক’ হিসেবেও পরিচিত হবে।
জে আই