দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার মধ্যে ইরাক থেকে ছোড়া ড্রোন হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার কথা স্বীকার করে ইরাক জানিয়েছে, হামলাটি ইরানের সীমান্তবর্তী মায়সান প্রদেশ থেকে চালানো হয়েছে। এ ঘটনায় ওই অঞ্চলের অপারেশনস কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তদন্ত শুরু করেছে ইরাক সরকার।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং পাইপলাইনের কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে রিয়াদ।
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। রয়টার্সের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ এই পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়।
হামলার পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের পর আপাতত কোনো পাল্টা হামলা চালাবে না বলে জানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড থেকে হামলা ঠেকাতে ইরাক সরকারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে সৌদি আরব।
তবে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা, স্থাপনা সুরক্ষা এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও জানিয়েছে, ড্রোন হামলাটি মায়সান প্রদেশ থেকে চালানো হয়েছে নিশ্চিত হওয়ার পর সেখানকার অপারেশনস কমান্ডারকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে সৌদি আরব ইরাকের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে হামলা চালিয়েছে। এসব গোষ্ঠী ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছিল রিয়াদ।
হামলার নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদও। পরিষদের মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই বলেছেন, এ হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্য বিপজ্জনক উত্তেজনা এবং অগ্রহণযোগ্য হুমকি। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক আইনের নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের অগ্রগতিতেও মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও নৌপথের ওপর চাপ বাড়ছে। চলতি সপ্তাহে হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে। গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নৌ চলাচল নিরাপদ।
শুক্রবার ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী কৌশলগত উপকূলীয় শহর মোকা ও এর আশপাশে হুথিদের অবস্থানে হামলা চালানোর দাবি করেছে। বাহিনীর মুখপাত্র মাজিদ আল-নুজাইলি জানান, হামলায় হুথিদের কয়েকটি যান ও অস্ত্র ধ্বংস এবং বেশ কয়েকজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত মোকা শহরটি বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তরে। বৃহস্পতিবার হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। তাদের হামলার পর বহু মানুষ ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদর দপ্তর এডেনে পালিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে আরও জানা গেছে, সরকারি বাহিনী লোহিত সাগর উপকূলবর্তী তাইজ ও এর পার্শ্ববর্তী ইব্ব গভর্নরেটেও হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আরব উপদ্বীপের দুই পাশের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও নৌপথে চাপ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা গত জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। এতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারের ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বেড়েছে।
এনার্জি অ্যাসপেক্টসের রিচার্ড ব্রোঞ্জ বিবিসিকে বলেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনার আগেই সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগর এবং আফ্রিকা ঘুরে সৌদি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে যাত্রার সময় প্রায় ৩০ দিন বেড়ে গিয়েছিল। এতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় তেলের বাজারে যে অতিরিক্ত মজুত ও সরবরাহের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল, তার বড় অংশই এখন শেষ হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুই সংকট অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও বাড়বে।
বিশেষ করে ডিজেল বাজারে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানান ব্রোঞ্জ। ডিজেলের দাম ইতোমধ্যে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা উৎপাদন ও পরিবহনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় বিভিন্ন পণ্যের খরচও বাড়িয়ে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে, এমনকি এর চেয়েও বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/