দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি যোদ্ধারা ঐতিহাসিক বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির সরকারের চার সামরিক সূত্র। তাদের এই অগ্রযাত্রায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালি নতুন করে হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবসমর্থিত সরকারি বাহিনীর সাম্প্রতিক দিনগুলোর লড়াই তীব্র হয়েছে। এতদিন মূলত দেশের উত্তরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকা হুতিরা এখন ইয়েমেনের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এতে নৌবাণিজ্য ব্যাহত করার ক্ষেত্রে তারা আরও শক্ত অবস্থানে যেতে পারে।
ইয়েমেনের সূত্রগুলো বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে জানায়, হুতিরা কৌশলগত লোহিত সাগরের হানিশ দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালিয়েছে। এতে সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা দক্ষিণে ধুবাবের দিকে সরে গেছে। ধুবাব বাব আল-মান্দাব প্রণালির ঠিক বিপরীতে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের কাছে। সূত্রগুলোর দাবি, ধুবাব ও পেরিম দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সৌদি আরবসমর্থিত বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ায় ইরান সংঘাতের পাশাপাশি আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ছিল। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর—দুই নৌপথেই সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলতে সৌদি আরব লোহিত সাগরের আরও উত্তরে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দর থেকে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল জাহাজে তুলছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে এশিয়ায় সৌদি আরবের তেল সরবরাহ আরও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশটির বিরুদ্ধে হুতিরা ইতিমধ্যে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিতে ইয়েমেনের কয়েক বছরের যুদ্ধ অনেকটাই থেমে যায়। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান আসেনি। সর্বশেষ লড়াই দেশটিতে আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরুর আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বাব আল-মান্দাবের অর্থ ‘অশ্রুর ফটক’। বিপজ্জনক নৌ চলাচল পরিস্থিতির কারণে প্রণালিটির এমন নামকরণ করা হয়েছে। আরব উপদ্বীপের ইয়েমেন এবং আফ্রিকার উপকূলে জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মধ্যবর্তী এই প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ। ফলে হুতিদের কাছে এর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভূমধ্যসাগরের দিকে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এই প্রণালি। সুয়েজ খাল কিংবা মিসরের লোহিত সাগর উপকূলের সুয়েজ-ভূমধ্যসাগর পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব পণ্য পরিবহন করা হয়। এ ছাড়া এশিয়াগামী বিভিন্ন পণ্য, যার মধ্যে রাশিয়ার তেলও রয়েছে, এই নৌপথ ব্যবহার করে।
তেহরানের প্রতি সতর্কবার্তা
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে থাকা এক সামরিক নেতা বৃহস্পতিবার পশ্চিম উপকূলে থাকা তার বাহিনীকে নিরাপদ স্থানে বিকল্প কমান্ডকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল-জুমহুরিয়া টেলিভিশন চ্যানেল এ তথ্য জানিয়েছে।
হুতিদের চাপে পশ্চিমাঞ্চল থেকে তার বাহিনী পিছু হটছে—এ নির্দেশনাকে তারেক সালেহর আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি নিহত ইয়েমেনি প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা।
এদিকে হুতিদের অগ্রযাত্রার মধ্যে হায়েস জেলার একটি নিরাপত্তা অধিদপ্তর ভবনে একদল হুতি যোদ্ধাকে উল্লাস করতে দেখা গেছে। রয়টার্সের যাচাই করা একটি ভিডিওতে তাদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
হুতিরা সৌদি আরবে হামলা বাড়ানোর পর তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানের প্রতি সৌদি আরবের সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তান। সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে লক্ষ্যেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, পাকিস্তান মঙ্গলবার তেহরানে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। এর জবাবে ইরান জানিয়েছে, ‘ইরান হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।’
তবে ইরানের দুটি সূত্র জানিয়েছে, তেহরান গত সপ্তাহে হুতিদের সৌদি আরবে হামলা চালাতে বলেছিল এবং অতিরিক্ত অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কয়েকজন ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কমান্ডারও হামলা সমন্বয়ে সহায়তা করতে ইয়েমেনে গিয়েছিলেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২০২৩ সালে ইসরায়েল ও গাজার যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলা চালিয়ে তা ব্যাহত করেছিল হুতিরা। এ বছর ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় লোহিত সাগরে জাহাজ ও সৌদি আরবে তাদের হামলা আবার শুরু হয়েছে।
সৌদি শহরগুলোতেও হামলা
হুতিরা বুধবার দাবি করেছে, সৌদি আরবের হামলায় ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী আল জাওফ, মারিব ও সাদা প্রদেশের পাশাপাশি দক্ষিণের তাইজ এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় হোদেইদা শহরেও হামলা হয়েছে। হোদেইদা হুতিদের শক্ত ঘাঁটি এবং নৌপথে তাদের বৃহত্তর হামলা পরিচালনার অন্যতম কেন্দ্র। তবে সৌদি আরব এসব হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
সৌদি আরব জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুতিদের হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হয়েছেন। হামলার লক্ষ্য ছিল দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা।
২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। এর পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণে এডেনের দিকে সরে যায়।
ইয়েমেনে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং সীমান্তে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় সৌদি আরব ২০১৫ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। এর পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকট তৈরি করে। সৌদি আরব ও তার জোটসঙ্গীদের বিমান হামলাসহ কয়েক বছর ধরে চলা তীব্র সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে।
ইরানের সমর্থনে হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি তার পাহাড়ি যোদ্ধাদের কয়েক হাজার সদস্যের একটি শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করেন। সংঘাতে হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা দেখিয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে তারা।
/অ