দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) প্রথম অবস্থানে উঠে আসায় চাপে পড়েছেন দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ। সোমবার তিনি এএফডির সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও নির্বাচনের ফল তাঁর দলকে ভিত পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়েছে বলে স্বীকার করেছেন।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের রাজ্য নির্বাচনে প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে অভিবাসনবিরোধী ও রাশিয়াপন্থী এএফডি। তবে ৮৩ আসনের রাজ্য আইনসভায় দলটি ৩৯টি আসন পেয়েছে, ফলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এখন মার্জের রক্ষণশীল দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতাকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে এএফডি।
এটি সফল হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনো রাজ্যে প্রথমবারের মতো উগ্র ডানপন্থী কোনো দল সরকার গঠন করবে। এ কারণে নির্বাচনের ফল শুধু জার্মানিতেই নয়, প্রতিবেশী ফ্রান্স ও পোল্যান্ডসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এএফডি অভিবাসীদের বহিষ্কার, ইউক্রেনকে জার্মানির সহায়তা বন্ধ এবং মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পক্ষে। দলটির সঙ্গে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা না করার দীর্ঘদিনের নীতিকে জার্মানিতে ‘ফায়ারওয়াল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। মার্জের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নও (সিডিইউ) এই নীতি অনুসরণ করে আসছে।
এএফডির জাতীয় সহ-প্রধান টিনো ক্রুপালা স্যাক্সনি-আনহাল্টে ‘মধ্য-ডানপন্থী রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ গঠনের সুযোগ করে দিতে সিডিইউর আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিন শেষ হওয়া উচিত।
মার্জ অবশ্য এএফডির সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনের ফলকে নিজের দলের কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ফল তাঁদের দলকে ভিত পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়েছে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ফলাফলে তাঁরা গভীরভাবে হতাশ ও বিস্মিত।
তবে নিজের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে মার্জ বলেন, তিনি সরকারের সংস্কার কর্মসূচি থেকে মোটামুটি একই পথে এগিয়ে যাবেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর জনপ্রিয়তা রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমে গেলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফেরাতে সংস্কার ও কিছু খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন তিনি।
নির্বাচনে এএফডির সাফল্যে মস্কো খুশি হয়েছে—এমন ইঙ্গিত দিয়ে মার্জ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে পশ্চিমা মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখার লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেন। ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষেও নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
মার্জ বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ও মূল্যবোধ রক্ষার অবস্থান থেকে তিনি এক মিলিমিটারও সরে যাবেন না। ইউক্রেনকে সহায়তা বন্ধ করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না, বরং আরও খারাপ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের হতাশাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালায় এএফডি। দলটি প্রতিষ্ঠিত দলগুলোকে ক্লান্ত ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে তুলে ধরে অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতি, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন সড়কের প্রতিশ্রুতি এবং জাতীয় গৌরব পুনরুদ্ধারের কথা বলে ভোট চায়। সাবেক কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির জীবনযাপনের প্রতি একাংশের নস্টালজিয়াও দলটির পক্ষে কাজ করেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ভোটারদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এএফডির সমর্থন বেশি। পুরুষ ভোটারদের ৫০ শতাংশ দলটিকে ভোট দিয়েছেন, যেখানে নারী ভোটারদের মধ্যে এই হার ৩৯ শতাংশ। দলটির সমর্থকদের বড় অংশ তুলনামূলকভাবে কম অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় থাকা ও কম শিক্ষিত ভোটার।
জার্মানির সাবেক কমিউনিস্ট পূর্বাঞ্চলের তুলনামূলক ছোট ও দরিদ্র রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির এই ফলকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন দলটির আরেক জাতীয় সহ-প্রধান অ্যালিস ভাইডেল। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৯ সালের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে অন্তত ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে তাঁদের।
জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার স্থানীয় শাখা এএফডিকে ডানপন্থী উগ্রবাদী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। তবে দলটি এই অভিযোগকে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা এবং তাদের লাখো সমর্থকের প্রতি অপমান বলে দাবি করে আসছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উগ্র ডানপন্থী নেতারা এএফডির ফলকে পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থনের নিদর্শন হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কও দলটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
তবে ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ ল্যস্কুর এ ফলকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া জনতুষ্টিবাদী ঢেউয়ের মুখে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
ফ্রান্সেও আগামী বছর জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মেরিন ল্য পেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে আসতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/