দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর ‘বিধ্বংসী’ সামরিক জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন যেকোনো হুমকির জবাব হবে ব্যাপক ও সিদ্ধান্তমূলক।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, সোমবার নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত ঘোষণা করা হবে। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘যেকোনো ধরনের সহায়তা’ দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আলি আবদুল্লাহি বলেন, স্থল, নৌ, আকাশ, আকাশ প্রতিরক্ষা ও সাইবার ক্ষেত্রে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শত্রুর নতুন হুমকির জবাব দেবে।
ইরানি গণমাধ্যমের বরাতে তিনি বলেন, ‘ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শত্রুর নতুন হুমকির জবাবে চূর্ণকারী, শাস্তিমূলক ও বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া জানাবে।’
প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে এখনো কোনো পক্ষই চূড়ান্তভাবে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। সংঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও জড়িয়ে পড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের অর্থনীতি ও প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তেহরানের কাছে এখনো এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ব্যবহার করা সম্ভব।
অন্যদিকে ট্রাম্পও যুদ্ধ শুরুর সময় নির্ধারণ করা কয়েকটি প্রধান লক্ষ্য এখনো অর্জন করতে পারেননি। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া এবং ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি করা। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে তার জনপ্রিয়তা বর্তমান মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, সরাসরি সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হতে পারবে না—ওয়াশিংটন সম্ভবত এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
ইরাক সফরে তিনি বলেন, ‘অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে আমরা তা অতিক্রম করতে পারি।’
তবে ইরান ও ইরাকের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপের কথাও স্বীকার করেন গালিবাফ। তার ভাষায়, শুধু সামরিক শক্তি থাকলেই হবে না; মানুষ ক্ষুধার্ত থাকলে এবং আর্থিক লেনদেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় উৎপাদন না থাকলে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
এদিকে শুক্রবার আন্তর্জাতিক ও মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়ায় আগামী সপ্তাহগুলোতে তেলের সরবরাহ আরও কঠোর হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে বাজারে দাম বেড়েছে।
বেসেন্ট সিএনবিসিকে বলেন, সোমবার সংবাদ সম্মেলনে নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত জানানো হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা এই শাসনব্যবস্থাকে পতনের দিকে নিয়ে যাব।’
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর প্রায় ৫০ বছর ধরে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে ইরান। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা, জ্বালানি সংকট এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে দেশটির জনগণ চাপের মধ্যে রয়েছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ক্লেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপথে ইরান থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে চীন। বেসেন্ট বলেছেন, চীনের জ্বালানির প্রায় অর্ধেক উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। তাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা করা তাদের জন্য যৌক্তিক হবে।
তবে চীনের দূতাবাস বলেছে, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যার সমাধানে সহায়ক নয়।’ তারা কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও পরিস্থিতি অনিশ্চিত রয়েছে। এপ্রিল ও জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দিলেও নৌ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফেব্রুয়ারির আগে এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো।
জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে ইরান ও ওমান পৃথকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে জাহাজ চলাচলে কোনো ধরনের কর আরোপের শর্ত থাকলে এমন চুক্তির বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে ন্যাটোর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেভিচ বুধবার জোটভুক্ত দেশগুলোর প্রতিরক্ষা প্রধানদের নিয়ে ভিডিও বৈঠক করেন। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে শুক্রবার রয়টার্সকে জানিয়েছেন তার মুখপাত্র। তবে এটি ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযান নয়।
/অ