দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

প্রশান্ত মহাসাগরে বিকাশমান এল নিনো পরিস্থিতি ‘জীবিতদের স্মৃতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী’ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর মেট অফিস। শক্তিশালী এই প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রবাহ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হওয়ায় ২০২৭ সাল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনা ‘খুব বেশি’ বলে জানিয়েছে মেট অফিস। এর আগে ২০২৪ সালকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কাইফ বলেন, এটি একটি নজিরবিহীন পরিস্থিতি। পূর্বাভাসে এল নিনোর এমন তীব্র সংকেত তিনি আগে কখনো দেখেননি।
এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় এরই মধ্যে পরিবর্তনের প্রমাণ মিলছে। ভারতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত এবং আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রম কমে যাওয়াকে এর সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মেট অফিসের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা চলতি বছরের শেষ দিকে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে পারে। বর্তমানে সেখানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বেশি। এমন পরিস্থিতি ১৯৫০ সালের পরের রেকর্ডে নজিরবিহীন হতে পারে এবং সম্ভবত ১৯ শতকের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এল নিনো কী
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াজনিত প্রবাহ, যা সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেয় এবং প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বায়ু দুর্বল হয়ে গেলে বা দিক পরিবর্তন করলে সমুদ্রের উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমুদ্র থেকে বিপুল তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে।
প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হলে বিজ্ঞানীরা এল নিনো পরিস্থিতি ঘোষণা করেন।
এবারের পরিস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে সমুদ্রের গভীরে জমে থাকা অতিরিক্ত উষ্ণ পানি। কিছু এলাকায় প্রায় ১০০ মিটার গভীরে পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই উষ্ণ পানি এল নিনোর জন্য অতিরিক্ত শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন কি এল নিনোকে শক্তিশালী করছে
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর ঘনত্ব বা তীব্রতা বাড়ছে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে গবেষণা ও বিতর্ক চলছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—উষ্ণতর পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে এল নিনোর প্রভাব পড়ছে। ফলে একই ধরনের আবহাওয়াজনিত প্রবাহ থেকেও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আগের তুলনায় বেশি হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে কী প্রভাব পড়তে পারে
এল নিনোর কারণে প্রশান্ত মহাসাগরে তাপের বণ্টন এবং বায়ুমণ্ডলের বায়ুপ্রবাহে পরিবর্তন ঘটে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনোর বছরে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৬ সালেও এই অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে পেরু, ইকুয়েডর ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা বাড়তে পারে। ক্যারিবীয় অঞ্চল ও ক্রান্তীয় আটলান্টিকে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রমও কমে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে
চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্যে যে রেকর্ড তাপপ্রবাহ দেখা গেছে, তার প্রধান কারণ এল নিনো নয় বলে মনে করা হচ্ছে। তবে শরৎ ও শীতের শুরুতে এর প্রভাব বেশি দেখা যেতে পারে।
উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি ও ঝড়ো আবহাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। শীতের শেষ দিকে আবার ঠান্ডা আবহাওয়ার সম্ভাবনাও কিছুটা বাড়তে পারে।
২০২৭ সালে ভাঙতে পারে উষ্ণতার রেকর্ড
এল নিনোর সময় সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব পরবর্তী ক্যালেন্ডার বছরেও বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রায় পড়তে পারে।
মেট অফিসের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. নিক ডানস্টোনের মতে, এল নিনোর শীতকালীন সর্বোচ্চ তীব্রতার পরের বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে ২০২৭ সাল ২০২৪ সালের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সতর্ক করেছে, এল নিনোর প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কোটি কোটি মানুষ সংকটময় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/