দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

২০২৭ সালের ২ আগস্ট। মিসরের প্রাচীন নগরী লুক্সরে তখন ভরদুপুর। নীল নদের তীরে তীব্র গরমে পুড়ছে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত জাদুঘর’খ্যাত এই শহর। রাজাদের উপত্যকা, রানিদের উপত্যকা আর হাজার বছরের পুরোনো মন্দির-সমাধির ওপর হঠাৎ করেই নেমে আসবে অন্ধকার।
কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো হারিয়ে যাবে। চাঁদের আড়ালে পুরোপুরি ঢাকা পড়বে সূর্য। আর সেই অন্ধকার স্থায়ী হবে টানা ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, লুক্সরের কাছে দেখা যাবে ২০২৭ সালের পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়। পৃথিবীর কোথাও ২১১৪ সালের আগে এর চেয়ে দীর্ঘ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না।
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম পূর্ণ সূর্যগ্রহণও এটি। ২০০৯ সালের জুলাইয়ে আরও দীর্ঘ সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল, তবে সর্বোচ্চ সময়ের সেই দৃশ্য ছিল জাপানের উপকূল থেকে কয়েক শ মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর। এবার বিরল এই দৃশ্য দেখা যাবে স্থলভাগে, আর তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় মঞ্চ হতে যাচ্ছে প্রাচীন মিসরের লুক্সর।
আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু হবে চাঁদের ছায়ার দীর্ঘ যাত্রা। এটি স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল, জিব্রাল্টার ও উত্তর মরক্কোর ওপর দিয়ে আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও মিসর অতিক্রম করবে। এরপর সৌদি আরব, ইয়েমেন ও সোমালিয়ার বিভিন্ন অংশ পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে গিয়ে শেষ হবে।
প্রায় ২৫৯ কিলোমিটার চওড়া এই ছায়াপথের মধ্যে পড়বে স্পেনের কাদিস, মরক্কোর টাঙ্গিয়ার্স, আলজেরিয়ার ওরান, লিবিয়ার বেনগাজি এবং সৌদি আরবের জেদ্দাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর।
তবে সবার নজর থাকবে লুক্সরের দিকে। প্রাচীন থিবস নগরীর ওপর গড়ে ওঠা নীল নদের দুই তীরের এই শহরের এক পাশে রাজাদের উপত্যকা, অন্য পাশে রানিদের উপত্যকা। ১৯৯১ সালের পর স্থলভাগে দেখা সবচেয়ে দীর্ঘ পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পটভূমি হিসেবে এর চেয়ে নাটকীয় দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন।
স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের কিছু পর শুরু হবে আংশিক সূর্যগ্রহণ। ধীরে ধীরে সূর্যের আলো কমতে থাকবে। দুপুর ১টা ৫ মিনিটে শুরু হবে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত—পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক রজার ডেভিসও অপেক্ষায় আছেন সেই মুহূর্তের। তিনি বলেন, ‘ছয় মিনিট ২৩ সেকেন্ড অনেক দীর্ঘ সময়। আপনার চোখ অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নেবে।’
সাধারণত পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় আকাশে কয়েকটি গ্রহ ও সবচেয়ে উজ্জ্বল কয়েকটি তারা দেখা যায়। তবে এত দীর্ঘ সময় অন্ধকার থাকায় এবার আরও অনেক কিছু দেখা যেতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
লুক্সরের জন্য আরেকটি সুখবর, আগস্টে সেখানে আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে। আরব ও সাহারা মরুভূমি থেকে উড়ে আসা ধুলা কিছুটা সমস্যা তৈরি করতে পারে, কিন্তু গ্রীষ্মে মেঘের উপস্থিতি খুব কম।
তবে প্রকৃতির এই মহা আয়োজনের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে প্রচণ্ড গরম। লুক্সরে গ্রীষ্মকালে দিনের তাপমাত্রা নিয়মিত ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। গ্রহণের সময় তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও দীর্ঘ সময় তীব্র গরমে থাকার কারণে পর্যবেক্ষক ও তাদের ক্যামেরা—দুজনের জন্যই তৈরি হতে পারে ঝুঁকি।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো মানুষের ভিড়। এই বিরল দৃশ্য দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সম্ভাব্য লাখো মানুষ লুক্সরে ছুটে আসতে পারেন। ফলে গ্রহণের দিন ঘনিয়ে আসার অনেক আগেই হোটেল কক্ষের সংকট দেখা দিয়েছে।
বুকিং ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গ্রহণের সময় লুক্সরে তাদের মাধ্যমে বুকিংযোগ্য ৯০ শতাংশের বেশি আবাসন ইতোমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলো অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলোর অনেকটিতে এক রাতের ভাড়া ২ হাজার পাউন্ডের বেশি, যা প্রায় ২ হাজার ৬৯৫ ডলার।
রজার ডেভিসের সঙ্গে যুক্ত নয় দিনের একটি ভ্রমণ কর্মসূচির খরচ শুরু হচ্ছে ৪ হাজার ৯৫০ পাউন্ড থেকে, যা প্রায় ৬ হাজার ৬০০ ডলার। সেটি ইতোমধ্যে পুরোপুরি বুকিং হয়ে গেছে। হার্ভার্ড অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের এক সপ্তাহের আরেকটি কর্মসূচিও পূর্ণ। সেখানে জনপ্রতি খরচ ২৬ হাজার ৯৫০ ডলার থেকে।
তবে এই সূর্যগ্রহণ শুধু লুক্সরের আকাশে অন্ধকার নামানোর গল্প নয়। এটি আফ্রিকার মহাকাশভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনাকেও নতুন করে সামনে আনছে।
বিশ্বজুড়ে আলোকদূষণ বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ খালি চোখে আকাশগঙ্গা দেখতে পারেন না। ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর আমেরিকার ৮০ শতাংশ মানুষ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ আলোকদূষিত আকাশের নিচে বাস করেন।
অন্যদিকে আলোকদূষণে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি দেশই আফ্রিকায়—চাদ, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও মাদাগাস্কার। নামিবিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাও অন্ধকার ও পরিষ্কার রাতের আকাশকে কেন্দ্র করে মহাকাশভিত্তিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার কারু মরুভূমির আকাশ এতটাই পরিষ্কার যে খালি চোখেই দেখা যায় আকাশগঙ্গার সবচেয়ে কাছের বৃহৎ ছায়াপথ অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা। রজার ডেভিসের ভাষায়, এটি তার দেখা সবচেয়ে অন্ধকার জায়গাগুলোর একটি।
আফ্রিকার আকাশে সূর্যগ্রহণের ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। ১৯১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার প্রিন্সিপে দ্বীপে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটনের দল। সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মহাকর্ষের প্রভাবে তারার আলো বেঁকে যাওয়ার ছবি ধারণের মাধ্যমে পরে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায়।
এরপর ১৯৭৩ সালে উত্তর আফ্রিকার আকাশে আরও ব্যতিক্রমী এক ঘটনা ঘটে। গবেষকেরা অতিদ্রুতগতির কনকর্ড শূন্য শূন্য এক উড়োজাহাজে ঘণ্টায় ১ হাজার ৩৫০ মাইল গতিতে চাঁদের ছায়াকে অনুসরণ করেন। এতে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের সময় ৭ মিনিট থেকে বাড়িয়ে ৭৪ মিনিটে নেওয়া সম্ভব হয়—যা এখনো ইতিহাসের দীর্ঘতম পর্যবেক্ষণের রেকর্ড।
এবার সেই মহাদেশেই আবার চোখ রাখবে বিশ্ব। ২০২৭ সালের ২ আগস্ট দুপুরে, হাজার বছরের পুরোনো মন্দির ও সমাধির শহর লুক্সরের আকাশে ধীরে ধীরে আলো কমে আসবে। তারপর কয়েক মিনিটের জন্য দিনের বুক চিরে নেমে আসবে রাত।
আর ঠিক ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের সেই অন্ধকার দেখতে লুক্সরের দিকে তাকিয়ে থাকবে পুরো পৃথিবী।
/অ