দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বুধবার সন্ধ্যায় বিরল মহাজাগতিক দৃশ্যের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন ইউরোপের কোটি কোটি মানুষ। স্পেনের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা, পর্তুগালের সামান্য অংশ, গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের কিছু এলাকায় দেখা যাবে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। পশ্চিম ইউরোপের যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড ও উত্তর ইতালির বিস্তীর্ণ অংশে সূর্যের আলোও প্রায় পুরোপুরি ঢেকে যাবে।
চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে সরাসরি চলে আসে, তখন সূর্যগ্রহণ ঘটে। চাঁদ সূর্যের আলো পুরোপুরি ঢেকে দিলে তাকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ বলা হয়। এ সময় পৃথিবীর যে অংশে চাঁদের মূল ছায়া পড়ে, সেটিকে পূর্ণগ্রহণের পথ বলা হয়। আর চাঁদের ছায়ার বাইরের অংশে থাকা অঞ্চল থেকে সূর্যের কিছু অংশ ঢাকা অবস্থায় দেখা গেলে সেটি আংশিক সূর্যগ্রহণ।
ল্যাঙ্কাশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ও জনপ্রিয় জ্যোতির্বিজ্ঞান সমিতির সহসভাপতি মেগান আরগো বলেন, ‘সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে হলে চাঁদ ও সূর্যকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একই সরলরেখায় অবস্থান করতে হয়। চাঁদের কক্ষপথ সামান্য হেলে থাকায় পৃথিবীকে প্রদক্ষিণের প্রতিবার সূর্যের চাকতির সামনে চাঁদকে দেখা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে হলে চাঁদের ছায়ার ঠিক মাঝামাঝি সরু পথে অবস্থান করতে হয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠে সেই পথটি বেশ সংকীর্ণ হওয়ায় সব জায়গা থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যায় না।’
বুধবারের এই পূর্ণ সূর্যগ্রহণ মূল ইউরোপে দুই দশকের মধ্যে প্রথম। যুক্তরাজ্য থেকে সর্বশেষ এমন পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল ১৯৯৯ সালে। তখন ডেভন ও কর্নওয়ালের কিছু অংশ পূর্ণগ্রহণের পথে ছিল। যুক্তরাজ্য থেকে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২০৯০ সালে।
তবে বুধবার যুক্তরাজ্যে পূর্ণ নয়, আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। বিশেষজ্ঞরা এটিকেও ১৯৯৯ সালের পর দেশটিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সূর্যগ্রহণ হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাজ্যে এর পর তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি ধরনের সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২০৮১ সালে।
স্পেনে পূর্ণগ্রহণের পথে থাকা এলাকাগুলোতে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৮টা ২৬ মিনিট থেকে ৮টা ৩৩ মিনিটের মধ্যে সূর্যগ্রহণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। সময়টি স্থানভেদে কিছুটা ভিন্ন হবে। তবে তখন সূর্য অস্ত যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে থাকবে।
যুক্তরাজ্যে লন্ডন থেকে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা শুরু হবে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিটে। সন্ধ্যা ৭টা ১৩ মিনিটে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং রাত ৮টা ৬ মিনিটে শেষ হবে। রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনউইচের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্যারিস হারবার্ট জানান, কর্নওয়ালে সূর্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ, পশ্চিম স্কটল্যান্ডে ৯৩ শতাংশ এবং লন্ডনে প্রায় ৯২ শতাংশ অংশ চাঁদের আড়ালে থাকবে।
তিনি বলেন, ‘সূর্য তখন দিগন্তের কাছাকাছি থাকবে। তাই যারা সূর্যগ্রহণ দেখতে চান, তাদের পশ্চিম দিগন্তে ভবন বা গাছপালা ছাড়া পরিষ্কার দৃশ্য দেখা যায়—এমন জায়গা বেছে নেওয়া উচিত।’
তাঁর মতে, যুক্তরাজ্যের সব অঞ্চল থেকেই খুব ভালো সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
তবে খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সাধারণ চশমা বা রোদচশমা ব্যবহার করেও সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো উচিত নয়। এতে চোখের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য বিশেষভাবে তৈরি গ্রহণ-চশমা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
গ্রহণ-চশমা না থাকলে ছিদ্রযুক্ত কোনো বস্তু ব্যবহার করে সূর্যের আলো কাগজ বা কার্ডের ওপর প্রতিফলিত করে পরোক্ষভাবে গ্রহণ দেখা যেতে পারে। তবে সেই বস্তু দিয়ে সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো যাবে না।
আকাশ পরিষ্কার থাকলে চাঁদ সূর্যের সামনে এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের চাকতি থেকে যেন ধীরে ধীরে একটি অংশ কেটে নেওয়া হচ্ছে—এমন দৃশ্য দেখা যাবে। একপর্যায়ে সূর্যের খুব সরু অংশ দৃশ্যমান থাকবে। এরপর চাঁদ সরে গেলে ধীরে ধীরে সূর্য আবার পুরোপুরি দৃশ্যমান হবে।
সূর্যগ্রহণ নিয়ে বিজ্ঞানীদেরও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এর মাধ্যমে সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা সৌর মুকুট নিয়ে গবেষণা করা যায়। সূর্যের বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন এবং সূর্যের কলঙ্ক ও সৌর সক্রিয়তার ১১ বছরের চক্রের সঙ্গে এর পরিবর্তনের সম্পর্কও বোঝা সম্ভব হয়।
১৯১৯ সালের সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের কাছাকাছি থাকা গ্রহ ও নক্ষত্রের অবস্থান পরিমাপ করতে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি পূর্বাভাসের সত্যতা যাচাই করা হয়।
সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সমতলে অবস্থান করলেই সূর্যগ্রহণ সম্ভব হয়। এর ফলে সূর্যগ্রহণের কয়েক সপ্তাহ আগে বা পরে চন্দ্রগ্রহণও ঘটে। এবার ২৮ আগস্ট ভোর ৫টার পর যুক্তরাজ্য থেকে আংশিক চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে।
এ সময় চাঁদ লালচে হয়ে ওঠায় সেটিকে অনেকে ‘রক্তচাঁদ’ বলে থাকেন। এ দৃশ্যও বেশ আকর্ষণীয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
এর পাশাপাশি ১২ থেকে ১৩ আগস্ট রাতভর পারসিড উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ পর্যায় হওয়ার কথা। ফলে সূর্যগ্রহণের পরও আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে উল্কাবৃষ্টির ঝলক দেখার সুযোগ মিলতে পারে।
/অ