দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

একটা তারিখ, নির্দিষ্ট সময়, একটি কথিত গোপন প্রকল্প আর কোটি মানুষের মৃত্যুর ভয়—সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল অবিশ্বাস্য এক দাবি। বলা হচ্ছিল, আগামী ১২ আগস্ট ঠিক ১৪টা ৩৩ মিনিটে গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী পৃথিবী সাত সেকেন্ডের জন্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হারাবে। এর ফলে পৃথিবীতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসবে এবং মারা যাবে প্রায় চার কোটি মানুষ।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই দাবির মাটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। নাসার বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পৃথিবী মাধ্যাকর্ষণ হারাবে না।
গুজবটির শুরু হয়েছিল কথিত একটি ‘গোপন’ নথিকে ঘিরে। দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের নভেম্বরে নাসার একটি গোপন নথি ফাঁস হয়েছে। সেখানে ‘প্রজেক্ট অ্যাঙ্কর’ নামে একটি প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে পৃথিবীকে এমন এক বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে প্রায় চার কোটি মানুষ মারা যেতে পারেন এবং আরও লাখ লাখ মানুষ আহত হতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিতে বলা হয়, ১২ আগস্ট ২০২৬, ঠিক ১৪টা ৩৩ মিনিট গ্রিনিচ মান সময় বা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় অনুযায়ী সকাল ৯টা ৩৩ মিনিটে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ সাত সেকেন্ডের জন্য উধাও হয়ে যাবে।
একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রশ্নও তোলেন, ‘এটি যদি ভুয়া হয়, তাহলে এর তারিখ, প্রকল্পের নাম ও বাজেট কেন আছে?’
এই প্রশ্নই গুজবটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে কথিত সেই ফাঁস হওয়া নথির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি ‘প্রজেক্ট অ্যাঙ্কর’ নামে নাসার কোনো প্রকল্পেরও সন্ধান মেলেনি।
গুজবের আরেকটি সূত্র হিসেবে সামনে আসে ইনস্টাগ্রামের ‘@mr_danya_of’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট। সেখানকার একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পৃথিবী সাত সেকেন্ডের জন্য মাধ্যাকর্ষণ হারাবে। পোস্টে আরও বলা হয়, নাসা বিষয়টি জানে এবং এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু কেন প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে তা মানুষকে জানানো হচ্ছে না।
ওই পোস্টে ‘প্রজেক্ট অ্যাঙ্কর’-এর জন্য নাসা ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছে বলেও দাবি করা হয়।
পোস্টে সম্ভাব্য পরিণতি হিসেবে অবকাঠামো ধ্বংস, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং ব্যাপক আতঙ্কের কথা বলা হয়। এমনকি মাধ্যাকর্ষণ না থাকার কারণে মানুষ পড়ে গিয়ে পৃথিবীতে প্রায় চার কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলেও অনুমান করা হয়।
এরপর গুজবটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলতে কেউ কেউ দাবি করেন, একই সময়ে আর্কটিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণও দেখা যাবে।
কিন্তু এই পুরো গল্পের পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
গুজবটির দাবি ছিল, দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষে তৈরি ‘মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গের’ ছেদ থেকে এই ঘটনা ঘটবে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ব্যাখ্যাই দেখিয়ে দেয় যে মাধ্যাকর্ষণ কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের মৌলিক ভুল ধারণা রয়েছে।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান স্নোপস নাসার কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিল। জবাবে নাসার এক মুখপাত্র সরাসরি বলেন, ‘২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পৃথিবী মাধ্যাকর্ষণ হারাবে না।’
নাসার ওই বিশেষজ্ঞ আরও ব্যাখ্যা করেন, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বা মোট মহাকর্ষীয় বল মূলত পৃথিবীর ভরের ওপর নির্ভর করে। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ হারাতে হলে পৃথিবীর কেন্দ্র, ম্যান্টল, ভূত্বক, মহাসাগর, স্থলভাগের পানি এবং বায়ুমণ্ডল—সব মিলিয়ে পৃথিবী ব্যবস্থার ভর কমে যেতে হবে।
অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ করে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ সাত সেকেন্ডের জন্য অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার কথা এখানে নেই।
এ বিষয়ে আরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন হার্টফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষ্ণগহ্বর বিশেষজ্ঞ ড. উইলিয়াম অলস্টন। তিনি বলেন, দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ থেকে তৈরি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এতটাই দুর্বল যে সেগুলো শনাক্ত করতেই বিজ্ঞানীদের অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র তৈরি করতে হয়েছে। পৃথিবীতে এর প্রভাব অনুভূত হওয়ার প্রশ্নই সেখানে আরও দূরের বিষয়।
তিনি জানান, কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষে তৈরি এসব তরঙ্গ নিয়মিত পৃথিবী ও মানুষের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এগুলো পৃথিবী ও আমাদের শরীরকে অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে সংকুচিত ও প্রসারিত করে। তবে সেই পরিবর্তন এতই ক্ষুদ্র—পরমাণুর আকারের চেয়েও বহু গুণ কম—যে তা মানুষের অনুভূত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আর যে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে গুজবটির প্রাথমিক প্রচার শুরু হয়েছিল, সেটিও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র নয়। ‘@mr_danya_of’ অ্যাকাউন্টটি আগে থেকেই সম্পূর্ণ মনগড়া প্রতিবেদন তৈরির জন্য পরিচিত।
তাই ১২ আগস্ট ঘড়ির কাঁটা ১৪টা ৩৩ মিনিট ছুঁলেই পৃথিবী হঠাৎ মাধ্যাকর্ষণ হারাবে, মানুষ আকাশে ভেসে উঠবে বা চার কোটি মানুষের মৃত্যু হবে—এমন আশঙ্কার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
নাসার বক্তব্য ও বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ১২ আগস্টও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ঠিক আগের মতোই থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘প্রজেক্ট অ্যাঙ্কর’-এর গল্পটি আসলে আরেকটি ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।
/অ