দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে একটি কাঠামোগত সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ‘সেবা ফি’ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। যুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি ফিরলে এই ফি থেকে বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার আয় হতে পারে বলে একটি হিসাব সামনে এসেছে।
তবে এটি কোনো নিশ্চিত আয় বা পূর্বাভাস নয়; সম্ভাব্য পরিস্থিতির ভিত্তিতে করা একটি হিসাব। বাস্তবে কত আয় হবে, তা নির্ভর করবে ফি কত নির্ধারণ করা হয়, কতটি জাহাজ তা পরিশোধ করবে, কোনো ছাড় দেওয়া হবে কি না এবং জাহাজ চলাচল আগের মাত্রায় ফিরে আসে কি না—এসব বিষয়ের ওপর।
যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি থেকে ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহন হতো। বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবহন হওয়া তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই সরু জলপথের ওপর নির্ভরশীল। বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রণালিটির ব্যবস্থাপনায় ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে আনুষ্ঠানিক ভূমিকা রাখার বিষয়ে তেহরান আলোচনা করছে।
তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা হলেই হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অবাধ নৌ চলাচল পুনরায় চালুর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান।
এর আগে ইরান জানিয়েছিল, ওমানের সঙ্গে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত পথ নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি করিডর শিগগিরই খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাস্তবে তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ট্রানজিট বা সেবা ফি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। অন্যদিকে ওমান মালাক্কা প্রণালির আদলে স্বেচ্ছাভিত্তিক ফি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ধরনের অর্থ নৌ চলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা ও উদ্ধারসেবার মতো কাজে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিয়ন্ত্রিত বাধ্যতামূলক ফি আরোপের বিরোধিতা করছে। ফলে সম্ভাব্য সমঝোতার ধরন, ফি আদায়ের পদ্ধতি এবং এর আইনি ভিত্তি নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে।
যুদ্ধ-পূর্ব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি ফিরে এলে এবং পণ্য মূল্যের ৭ শতাংশ ফি আদায় করা সম্ভব হলে প্রতিদিন প্রায় ৩৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় হতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে। বছরে তা প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। অত্যন্ত উচ্চ মুনাফার হার ধরে নিলে সম্ভাব্য নিট আয় প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার হতে পারে।
একটি বড় তেলবাহী জাহাজে সর্বোচ্চ প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহন করা যায়। ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ৮০ ডলার ধরলে পুরো চালানের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬ কোটি ডলার। এর ৭ শতাংশ ফি হলে একটি জাহাজ থেকেই প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ডলার আদায় হতে পারে।
তবে এই হিসাবের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। জাহাজ মালিক ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ব্যয় বা আইনি ঝুঁকির কারণে হরমুজ এড়িয়ে যেতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইন থাকলেও তা দিয়ে স্বাভাবিক প্রবাহের কেবল একটি অংশ পরিবহন করা সম্ভব। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞা, বিমা, অর্থ পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক আইনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিতর্কিত। সমুদ্র আইনবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রাকৃতিক প্রণালিতে উপকূলীয় কোনো দেশ ইচ্ছামতো পারাপারের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারে না। তবে নির্দিষ্ট নৌ-নিরাপত্তা, নেভিগেশন বা উদ্ধারসেবার বিনিময়ে ফি নেওয়ার সুযোগ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনেই রয়েছে। ফলে ইরানের প্রস্তাবিত ‘সেবা ফি’ সত্যিকার অর্থে সেবা বাবদ নেওয়া অর্থ, নাকি পারাপারের অনুমতির বিনিময়ে শুল্ক—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। কারণ, বাধ্যতামূলক ফি আদায় কার্যকর হলে তা শুধু রাজস্বের উৎস নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরির সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে।
তবে ৭ শতাংশ ফি থেকে ১৪ হাজার কোটি ডলার আয়ের হিসাবটি উচ্চমাত্রার সম্ভাব্য পরিস্থিতি। ফি কম হলে, স্বেচ্ছাভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে, জাহাজ চলাচল কমে গেলে কিংবা ওমানসহ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি হলে আয় নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শিগগিরই শেষের দিকে যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে হবে’ এবং ইরান ‘আর বেশি সময় চালিয়ে যেতে পারবে না’।
ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে কি না, ইরান আদৌ কোনো ফি আদায়ের সুযোগ পাবে কি না এবং সম্ভাব্য সমঝোতা কীভাবে কার্যকর হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো আলোচনার টেবিলেই রয়েছে।
/অ