দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

শিশুদের জন্য নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটাকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর এক বিচারক। এর মধ্য দিয়ে শিশু নিরাপত্তা ইস্যুতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এটিই সবচেয়ে বড় আর্থিক রায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দেওয়া রায়ে বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড বলেন, মেটা একটি ‘জনউপদ্রব’, যা বায়ুদূষণের মতোই সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তিনি ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি কমাতে একটি তহবিল গঠনের জন্য এই অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেন।
এর আগে একই মামলায় মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। নতুন জরিমানাসহ মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।
রায়ে বিচারক বলেন, একটি কারখানা যেমন বিজ্ঞাপন ও পণ্য উৎপাদন করে, তেমনি মেটার ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন ধরনের বিষয়বস্তু তার ‘পণ্য’। আর শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ সেই কারখানার দূষণের মতো, যা প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।
ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডসের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জানিয়েছে, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে।
প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, তাদের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের নিরাপদ রাখতে তারা কাজ করে যাচ্ছে। ক্ষতিকর ব্যক্তি ও বিষয়বস্তু শনাক্ত ও অপসারণের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তারা সবসময় স্বচ্ছ ছিল। অনলাইনে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় নিজেদের কার্যক্রমের বিষয়ে তারা আস্থাশীল এবং তথ্যের ভুল উপস্থাপনার ভিত্তিতে আনা অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।
এর আগের রায়ের পরও মেটা একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে আপিলের ঘোষণা দিয়েছিল। তখনই প্রথম কোনো অঙ্গরাজ্য শিশু নিরাপত্তা ইস্যুতে মেটার বিরুদ্ধে সফলভাবে মামলা জেতে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একই ধরনের অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে হাজারো মামলা চলছে। নিউ মেক্সিকোর এই দুই রায়ের পাশাপাশি চলতি বছর লস অ্যাঞ্জেলেসেও একই ধরনের একটি মামলায় প্রতিষ্ঠানটি হেরে যায়।
নিউ মেক্সিকোর মামলাটি ২০২৩ সালে অঙ্গরাজ্যটির আইনজীবীরা দায়ের করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং যৌন স্পষ্ট বিষয়বস্তু ও যৌন শিকারিদের সংস্পর্শে পৌঁছে দিয়েছে।
মামলার প্রথম ধাপে আদালত রায় দেন, মেটার সুপারিশভিত্তিক অ্যালগরিদম কিশোর ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর বিষয়বস্তু ও যোগাযোগের দিকে কার্যত পরিচালিত করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি নিউ মেক্সিকোর অযৌক্তিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমবিষয়ক আইন বারবার লঙ্ঘন করেছে।
দ্বিতীয় ধাপের রায়ে বিচারক বলেন, মেটার কর্মকাণ্ডের ক্ষতি এতটাই বিস্তৃত যে তা ‘জনউপদ্রব’-এর পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এটি এমন একটি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা, যা পুরো সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রায়ে আরও বলা হয়, একটি কারখানার দূষিত বায়ু যেমন সাধারণ মানুষের পরিচ্ছন্ন বাতাস পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তেমনি মেটার প্ল্যাটফর্মে শিশুদের যে ক্ষতি হয়, তা শুধু প্ল্যাটফর্মেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমগ্র ইন্টারনেট ও বাস্তব জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু, তাদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ওপর।
আদালতের নির্দেশে গঠিত তহবিলের অর্থ ক্ষতির প্রভাব কমাতে ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে ৪২০ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে সৃষ্ট ক্ষতির চিকিৎসা ও উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কার্যক্রমে ব্যয় করা হবে।
এ ছাড়া শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের জন্য শিশুদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণেও তহবিলের একটি অংশ ব্যয় হবে।
রায়ে মেটাকে আরও কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যবহারকারীর হিসাব যেন প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে সুপারিশ না করা হয়, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক যেন অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীকে বার্তা পাঠাতে না পারে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের নগ্ন ছবি বা ভিডিও পাঠানো ও গ্রহণ নিষিদ্ধ করা এবং শিশু যৌন শোষণের সঙ্গে জড়িত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ‘একবারেই স্থায়ী ব্যবস্থা’ নীতি কার্যকর করা।
এ ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য পছন্দসূচক গণনা প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এবং শিক্ষাবর্ষ চলাকালে সপ্তাহের কর্মদিবসে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো তাৎক্ষণিক বার্তা-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি পাঠানো যাবে না। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক মিলিয়ে তাদের মাসিক ব্যবহারসীমা সর্বোচ্চ ৯০ ঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা।
আগামী সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ায় মেটার বিরুদ্ধে আরও একটি বড় বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন ডজন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
/অ