দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। আঞ্চলিক পাঁচটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
সূত্রগুলোর মতে, ২৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেওয়ার পর তেহরান উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোকে এ বার্তা দেয়।
আলোচনার বিষয়ে অবগত দুই ইরানি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই সূত্র এবং এক জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিক জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলেন। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য দিয়েছেন।
জ্যেষ্ঠ ওই কূটনীতিক জানান, আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন ট্রাম্পকে নতুন হামলা থেকে বিরত রাখতে নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ইরানের ওপর হামলা হলে উপসাগরজুড়ে মার্কিন সম্পদ ও জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানো হবে।
কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি আলোচনায় আরাঘচির বার্তা ছিল একই—‘আমরা পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। তবে বৃহত্তর সংঘাত ও ধ্বংস এড়াতে কূটনৈতিক সমাধানই সর্বোত্তম পথ।’
উপসাগরীয় একটি সূত্র জানায়, ইরানের সতর্কবার্তা ছিল স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানা হবে।
রয়টার্স বলছে, এ কূটনৈতিক তৎপরতা দেখাচ্ছে যে, নতুন মার্কিন হামলা ঠেকাতে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কাকে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা এবং জ্বালানি রপ্তানিনির্ভর উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কঠিন অবস্থানে পড়েছে।
জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও উপসাগরীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সামরিক পদক্ষেপ বিলম্বিত করে আলোচনায় ফিরে যাওয়া, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান।
আরেকটি উপসাগরীয় সূত্র জানায়, ইরানের এ সতর্কবার্তা সব উপসাগরীয় দেশের উদ্দেশে হলেও মূলত সৌদি আরব ও কাতারের মাধ্যমে তা পৌঁছে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাবেক আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছে তেহরান।
দ্বিতীয় এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, কাতার, ওমান ও সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও তেহরানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন করে হামলা হলে পুরো অঞ্চল ‘অগ্নিগোলকে’ পরিণত হতে পারে।
গত ২ আগস্ট ট্রাম্প বলেন, দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হলে তিনি ইরানের ওপর পরিকল্পিত হামলা বাতিল করতে রাজি।
প্রথম উপসাগরীয় সূত্র জানায়, সৌদি আরবের বিশ্বাস, উত্তেজনা আরও বাড়লে শুধু ধ্বংসই বাড়বে। সে কারণেই তারা ট্রাম্পকে কূটনীতিকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটনের প্রতি কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানালেও নিজেদের নিরাপত্তার প্রশ্নে অবস্থান স্পষ্ট করেছে রিয়াদ। দ্বিতীয় উপসাগরীয় সূত্রের দাবি, সৌদি আরব জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে হামলা হলে সামরিক জবাব দেওয়া হবে।
সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক আলি শিহাবি বলেন, সৌদি আরবের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আরও উত্তেজনা কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না। তার মতে, ‘যথাযথ সামরিক প্রতিক্রিয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ওপর ধারাবাহিক চাপ—এই দুইয়ের সমন্বয়ই বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর পথ।’
ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব বারবার উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি বন্ধের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তেহরানের বিশ্বাস, এসব তথ্য তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, নতুন করে মার্কিন হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা, শোধনাগার, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, পানি অবকাঠামো, পরিবহন নেটওয়ার্ক ও তেলক্ষেত্রে হামলা চালানো হবে—এ কথাও সতর্কবার্তায় স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ ইরানের অবকাঠামোকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ইরানের ক্ষতি হলে তার চেয়ে অনেক বড় ক্ষতি আমরা ফিরিয়ে দেব।’
একই সঙ্গে তিনি ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সেই ঘটনায় সৌদি আরবের অর্ধেকের বেশি অপরিশোধিত তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকির মাধ্যমে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও তার আরব মিত্রদের বোঝাতে চাইছে যে, ইরানের ওপর আরেকটি হামলার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য অত্যন্ত বড় হবে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক দেশগুলোকে ট্রাম্পের ওপর নতুন সামরিক পদক্ষেপ এড়ানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করাই ইরানের লক্ষ্য।
জ্যেষ্ঠ এক ইরানি কর্মকর্তার মতে, তেহরানের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি কঠিন বিকল্প রয়েছে—এমন সংঘাত আরও বাড়ানো, যা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে; অথবা এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, যা ওয়াশিংটনের প্রত্যাশিত নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করবে না।
অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিকের ভাষ্য, সমঝোতার পথে অন্যতম বড় বাধা হলো—তেহরানকে বিজয়ী দাবি করার সুযোগ দিতে ওয়াশিংটনের অনীহা। তার ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু চায়, যা দেখিয়ে বলতে পারবে যে তারা এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে।’
সূত্র: রয়টার্স
/অ