দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পাঁচ মাস ধরে আঞ্চলিক সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়াতে চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। এমনকি ইরান-সমর্থিত ড্রোনে দেশটির তেল স্থাপনায় হামলা হলেও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল রিয়াদ। তবে সাম্প্রতিক হামলার পর সেই সংযমের নীতি থেকে সরে এসে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সৌদি আরব একসঙ্গে তিন দিক থেকে নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে—ইরান, ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা।
সপ্তাহজুড়ে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাকভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন হামলা এবং তেহরানের নতুন হুমকির পর রিয়াদের সামনে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মঙ্গলবার ভোরে সৌদি যুদ্ধবিমান যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সঙ্গে ইরাকের পূর্বাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে হামলা চালায়।
তবে এই সংঘাতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া সৌদি আরবের জন্য বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। গত এক দশক ধরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে দেশটি। সেই কারণেই ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছিল রিয়াদ।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কৌশল বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
হুথিদের নতুন চাপ
সপ্তাহান্তে ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। স্যাটেলাইট চিত্রে জাজান এলাকার একটি স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এর আগে হুথিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজ অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং কয়েকটি তেলবাহী জাহাজেও হামলার দাবি করে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। আগামী তিন বছরে প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বাব আল-মান্দাবে হুথিদের হামলা সৌদি অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
ইরাক থেকেও হামলা
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো রিয়াদ ও গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে সৌদি আরব ইরাকের পূর্বাঞ্চলে এসব গোষ্ঠীর অবস্থানে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটি সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, যৌথ এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের নির্দেশনায় পরিচালিত ধারাবাহিক ড্রোন হামলার জবাব দেওয়া।
ইরানের হুমকি
মার্চ ও এপ্রিল মাসে ইরানের শাহেদ ড্রোন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পর দেশটি ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে কাজ শুরু করে।
যদিও এপ্রিলের পর ইরান সরাসরি সৌদি আরবে হামলা চালায়নি, তবু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি অভিযোগ করেছে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা আবার শুরু হলে সৌদি আরব কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়বে। সরাসরি পাল্টা হামলা চালালে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে, আবার নীরব থাকলে তেহরান আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে
যুদ্ধের প্রভাব সৌদি অর্থনীতিতেও পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি ২০১৮ সালের পর সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক বাজেট ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছে।
তেলের দাম বাড়ায় কিছুটা রাজস্ব বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদন বা রপ্তানি ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। ইতোমধ্যে সৌদি আরবের কয়েকটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিধিও কমানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অস্থির। ফলে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব এখন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আরও সক্রিয় সামরিক কৌশলের দিকে ঝুঁকছে।
/অ