দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক নিউজিল্যান্ড সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রায় চার দশক পর কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ভারত ও নিউজিল্যান্ড তাদের সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-এ উন্নীত করেছে। একই সঙ্গে গৃহীত হয়েছে ‘ইন্ডিয়া–নিউজিল্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ: রোডম্যাপ টু ২০৩০’, যা আগামী বছরগুলোতে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, কৃষি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সনের আতিথ্য গ্রহণকারী এই সফরে দীর্ঘদিনের আলোচিত ভারত–নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি স্বাক্ষরিত হয়েছে ১০টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং ঘোষণা করা হয়েছে ৮টি নতুন সহযোগিতা উদ্যোগ, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
বাণিজ্যে নতুন গতি
ভারত–নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সহজীকরণ, সেবা খাতে সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং দক্ষ জনশক্তির চলাচল আরও সহজ হবে। দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে পণ্য ও সেবা খাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৭ বিলিয়ন নিউজিল্যান্ড ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দুই দেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি ছিল ৫৬৬.৫১ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ৫৮৯.১০ মিলিয়ন ডলার। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাণিজ্য ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
অকল্যান্ডে ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবকাঠামো, বেসামরিক বিমান চলাচল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, ফিনটেক এবং উদীয়মান প্রযুক্তিতে নিউজিল্যান্ডের বিনিয়োগকারীদের ভারতের প্রবৃদ্ধির অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান।
কৃষি ও খাদ্য খাতে সহযোগিতা
দুই দেশ কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি অ্যাগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টিভিটি পার্টনারশিপ গঠন করেছে। কিউই ফল, আপেল ও মধু উৎপাদন ও গবেষণায় যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতের নাগাল্যান্ড ও উত্তরাখণ্ডে কিউই চাষের জন্য সেন্টার অব এক্সেলেন্স স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রাণিসম্পদ, দুগ্ধশিল্প, উদ্যানতত্ত্ব, বনায়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও টেকসই কৃষি উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় জোর
সফরে প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক সহযোগিতাও উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনী ও নিউজিল্যান্ড প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে মিউচুয়াল লজিস্টিকস সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট, মেরিটাইম কো-অপারেশন অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং হাইড্রোগ্রাফি ও নটিক্যাল কার্টোগ্রাফি সংক্রান্ত বাস্তবায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদ ও সাইবার নিরাপত্তায় সহযোগিতা
উভয় দেশ যৌথ সন্ত্রাসবাদবিরোধী ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, আর্থিক অপরাধ, সাইবার অপরাধ এবং আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ভারত–নিউজিল্যান্ড সাইবার সংলাপ অব্যাহত রাখার বিষয়েও সম্মতি হয়েছে।
শিক্ষা, গবেষণা ও জলবায়ু সহযোগিতা
শিক্ষা ও গবেষণা খাতে ছাত্র বিনিময়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সহযোগিতা এবং যৌথ গবেষণা সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর পোলার অ্যান্ড ওশান রিসার্চ এবং নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টারবারির মধ্যে অ্যান্টার্কটিকা গবেষণায় সমঝোতা হয়েছে।
এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ভূমিকম্প ও সুনামি প্রস্তুতি, জলবায়ু সহনশীলতা এবং পর্যটন উন্নয়নেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। উভয় দেশ ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স, কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং গ্লোবাল বায়োফুয়েলস অ্যালায়েন্স-এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
জনগণের সম্পর্ক আরও গভীর
সফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ‘কিয়া ওরা মোদি’ অনুষ্ঠানে ১০ হাজারের বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির মতবিনিময়। তিনি নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত ভারতীয় সম্প্রদায়কে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম শক্তিশালী সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করেন।
ক্রীড়া, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণেও একাধিক সমঝোতা হয়েছে। দুই দেশ ‘ইন্ডিয়া–নিউজিল্যান্ড জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যান অন স্পোর্ট’ গ্রহণ করেছে, যার আওতায় কোচিং, ক্রীড়াবিজ্ঞান ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণে সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অভিন্ন অবস্থান
দুই নেতা একটি স্বাধীন, উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গঠনের পক্ষে অভিন্ন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে ইউএনসিএলওএস-এর প্রতি শ্রদ্ধা, আসিয়ান নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক কাঠামোর সমর্থন এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের পক্ষে মত প্রকাশ করা হয়। নিউজিল্যান্ড পুনরায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ভারতের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী মোদির এই সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ই সূচনা করেনি, বরং ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও গড়ে তুলেছে। ২০৩০ সালের রোডম্যাপ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের সম্পর্ক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্বের মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
সূত্র: ইউরোপিয়ান টাইমস
এমএস/