দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত সামরিক জোটের শীর্ষ বৈঠকে তাৎক্ষণিক সংকট কাটিয়ে উঠলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বৈঠকের শুরুতে ট্রাম্প জোটের সদস্য স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ দেন এবং কয়েকটি সদস্য দেশের সমালোচনা করেন। তবে কয়েক ঘণ্টা পর তিনি আবারও জোটের প্রতি নিজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলে ইউরোপীয় নেতারা বৈঠকটিকে সফল হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
বৈঠক শেষে ইউরোপীয় নেতারা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান। তারা ট্রাম্পের কক্ষে ভালোবাসার পরিবেশ থাকার মন্তব্য, পারস্পরিক প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত পঞ্চম অনুচ্ছেদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা ঘোষণায় তার সমর্থন এবং ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখেন।
এর আগে ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রচেষ্টা এবং ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মতবিরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক তীব্র চাপে পড়েছিল। সেই সময় ট্রাম্প সামরিক জোট নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনা পুনরায় সামনে আনেন এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন।
ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতেও সম্পর্কের ওঠানামা থাকতে পারে। তবু তারা যুক্তরাষ্ট্রকে জোটের মধ্যে রাখাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ছাড়া রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার মুখে তারা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারেন।
শীর্ষ বৈঠক শেষে মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, সামরিক জোটে যুক্তরাষ্ট্রই প্রধান শক্তি। তার ভাষ্য, এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুরো জোটের অর্থনীতির অর্ধেক এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা জোটের বাকি সদস্যদের সম্মিলিত সামরিক শক্তির সমান। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও মস্কোকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সক্ষমতা ক্ষুণ্ন হয়নি।
তবে এ মূল্যায়নের সঙ্গে সবাই একমত নন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জিম টাউনসেন্ড বলেন, ট্রাম্পের অবস্থান নমনীয় হলেও ইতোমধ্যে যে ক্ষতি হয়েছে তা থেকে গেছে। তার মতে, রাশিয়া এবং সদস্য দেশগুলোর করদাতাদের কাছে জোটের শক্তিশালী হওয়ার বার্তা পৌঁছানো উচিত ছিল, কিন্তু অতিরিক্ত নাটকীয়তায় সেই বার্তা আড়াল হয়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউরোপীয় কূটনীতিকও মনে করেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোর ক্ষতি এই বৈঠকে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। তবে পরিস্থিতির আরও অবনতি না হওয়াকেই তিনি অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
বৈঠক ইতিবাচকভাবে শেষ হওয়ায় মহাসচিব মার্ক রুটে এবং আয়োজক তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের জন্য এটি আংশিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৈঠকের আগে রুটে এবং জোটের অন্য কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা পাশে রেখে জোটের প্রতি অঙ্গীকার বজায় রাখতে উৎসাহিত করেন। একই সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর বিষয়টিকে তার ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপকে প্রতিরক্ষা খাতে আরও বেশি ব্যয় করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তার প্রশাসনও চায়, ইউরোপ নিজ মহাদেশের প্রচলিত প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব গ্রহণ করুক।
গত মাসে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় ইউরোপীয় সদস্য দেশ ও কানাডার প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বৃদ্ধি তুলে ধরে বিভিন্ন তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এর একটি তথ্যচিত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ এক লাখ একুশ হাজার কোটি ডলার হিসেবে দেখিয়ে তা ট্রাম্পের অবদান বলে উল্লেখ করা হয়, যদিও ওই হিসাবের মধ্যে জো বাইডেনের চার বছরের শাসনামলও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বৈঠকের আগে এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানান, ওয়াশিংটনে রুটের আচরণ নিয়ে কয়েকজন রাষ্ট্রদূত সমালোচনা করেছেন। তবে অন্যদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার কার্যকর বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ইরান যুদ্ধের সময় সামরিক জোটভুক্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা দেয়নি—ট্রাম্পের এমন অভিযোগের জবাবেও কর্মকর্তারা তথ্য প্রস্তুত করেন। রুটে বলেন, স্পেন নিজ ভূখণ্ডের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দিলেও অন্য মিত্ররা মূলত আগের চুক্তিগুলো অনুসরণ করেছে।
তবে এই বক্তব্য ইউরোপের মধ্যেও বিতর্ক সৃষ্টি করে। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো অভিযোগ করেন, ইতালির ঘাঁটি থেকে প্রায় পাঁচশ মার্কিন যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের বিষয়ে রুটে বিভ্রান্তিকর বার্তা দিয়েছেন।
শীর্ষ বৈঠকের আগে আঙ্কারায় আয়োজিত প্রতিরক্ষা শিল্পবিষয়ক এক প্রদর্শনীতে নজরদারি বিমান, চালকবিহীন উড়োজাহাজ এবং পরিবহন উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কেনার একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সামরিক জোটের তথ্য অনুযায়ী, এসব চুক্তির মোট মূল্য পাঁচ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
তবে বৈঠকের ইতিবাচক প্রভাব কতদিন থাকবে, তা নিয়ে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এখনো সতর্ক। সংকটের সময় মোতায়েনের প্রতিশ্রুত বাহিনীর সংখ্যা ইতোমধ্যে কমানোর পর গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ইউরোপে অবস্থানরত প্রায় আশি হাজার মার্কিন সেনার উপস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
এদিকে অনেক সদস্য রাষ্ট্র মনে করছে, ভবিষ্যতে এমন উত্তেজনা কমানোর একটি উপায় হতে পারে শীর্ষ বৈঠকের সংখ্যা কমিয়ে আনা। আগামী বছর আলবেনিয়ায় নেতাদের বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনাও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক জন আর. ডেনির মতে, প্রতি বছর জোটকে অস্তিত্বসংকটের মুখোমুখি করার পরিবর্তে এ ধরনের বৈঠকে সাময়িক বিরতি দেওয়াই বেশি যুক্তিসংগত।
/অ