দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

২০২০ সালে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সেই উদ্যোগকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। এর ঠিক ছয় বছর পর, ২০২৬ সালে আরেকটি নতুন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে—‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’।
বৈশ্বিক আইন সংস্থা ডিএলএ পাইপারের মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই যৌথভাবে যে কাঠামোর ঘোষণা দিয়েছেন, তা কেবল দুটি দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়। বরং লাতিন আমেরিকায় ইসরায়েলের প্রভাব বিস্তার, যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ একটি রাজনৈতিক জোট গঠন এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেও একে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, আইজ্যাক অ্যাকর্ডস হলো একটি নতুন কৌশলগত কাঠামো। এর লক্ষ্য হলো আর্জেন্টিনা, ইসরায়েল এবং পশ্চিম গোলার্ধের সমমনা দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এই চুক্তিতে অংশ নেওয়া দেশগুলো গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী অবস্থান, ইহুদিবিদ্বেষ প্রতিরোধ এবং মাদক পাচারের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘পশ্চিম গোলার্ধে সমমনা অংশীদারদের মধ্যে নতুন কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামো’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশেষভাবে এতে ইরানের প্রভাব ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বিস্তারের বিরুদ্ধে সমন্বয় বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের লাতিন আমেরিকান সংস্করণ। তবে এখানে সম্পর্ক নতুন করে স্বাভাবিক করার প্রশ্ন নেই, কারণ আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের মধ্যে আগে থেকেই কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। মূলত বিদ্যমান সম্পর্ককে একটি শক্তিশালী কৌশলগত জোটে রূপ দেওয়াই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য।
ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের অভিন্ন পিতৃপুরুষ আব্রাহামের (ইব্রাহিম আ.) নামানুসারে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর নামকরণ হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন উদ্যোগটির নাম রাখা হয়েছে আব্রাহামের পুত্র আইজ্যাকের (ইসহাক আ.) নাম থেকে।
আমেরিকান জুয়িশ কমিউনিটির মতে, এই নামের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা এমন একটি জোটের ধারণা তুলে ধরতে চেয়েছেন, যা ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং পশ্চিমা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।
আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের মূল ধারণাটি প্রথম সামনে আনেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। ২০২৫ সালে তিনি ইসরায়েলের মর্যাদাপূর্ণ ‘জেনেসিস প্রাইজ’ লাভ করেন। পুরস্কারের অর্থ ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ না করে তিনি তা আইজ্যাক অ্যাকর্ডস বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহারের আহ্বান জানান। পরে সেই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘আমেরিকান ফ্রেন্ডস অব আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ নামে একটি অলাভজনক সংস্থা গঠন করা হয়।
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে মিলেই এক মিলিয়ন ডলারের এই উদ্যোগের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এর উদ্দেশ্য ইসরায়েল ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা। শুরুতে উরুগুয়ে, পানামা ও কোস্টারিকাকে এর সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
অবশেষে ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল জেরুজালেমে মিলেই ও নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের যাত্রা শুরু করেন। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন, যা এই উদ্যোগের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রচ্ছন্ন আগ্রহেরই ইঙ্গিত দেয়।
ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনার সম্পর্কের শিকড় বেশ গভীরে প্রোথিত। ১৯৪৯ সালে আর্জেন্টিনা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। লাতিন আমেরিকার মধ্যে আর্জেন্টিনাতেই সবচেয়ে বড় ইহুদি জনগোষ্ঠীর বসবাস, যা দুই দেশের সম্পর্ককে একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি দিয়েছে।
তবে এই সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। ১৯৬০ সালে নাৎসি যুদ্ধাপরাধী অ্যাডলফ আইখম্যানকে বুয়েনস এইরেস থেকে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা গোপনে ধরে নিয়ে গেলে দুই দেশের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ১৯৯২ সালে বুয়েনস এইরেসের ইসরায়েলি দূতাবাস এবং ১৯৯৪ সালে এএমআইএ (AMIA) ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ বোমা হামলা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন মোড় দেয়। আর্জেন্টিনার তদন্তে এই হামলাগুলোর জন্য ইরান ও হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্টদের দায়ী করা হয়, যা মূলত ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনাকে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট মিলেই ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের গণ্ডি পেরিয়ে কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিতে শুরু করেছে। ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ সেই দীর্ঘ সম্পর্কেরই সর্বশেষ এবং সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী অধ্যায়।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইস বলছে, বর্তমানে ইসরায়েল-আর্জেন্টিনার সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে রয়েছে। মিলেই ক্ষমতায় আসার পর থেকে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। তিনি প্রকাশ্যে নিজেকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে জায়নবাদপন্থী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং একাধিকবার ইসরায়েল সফর করেছেন।
মিলেইর সরকার ইতিমধ্যে জাতিসংঘে একাধিক ইস্যুতে ইসরায়েলপন্থী অবস্থান নিয়েছে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়িয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং জেরুজালেমে নিজস্ব দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দুই দেশের কর্মকর্তারা নতুন সহযোগিতার যেসব ক্ষেত্র ঘোষণা করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা সহযোগিতা, সুপারকম্পিউটিং, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং সরাসরি বিমান যোগাযোগ। ডিএলএ পাইপারের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আর্জেন্টিনা নিজেকে এখন লাতিন আমেরিকায় ইসরায়েলের প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অনুঘটক সম্ভবত ইরান। এল পাইসের প্রতিবেদনে এমনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। অতীতে বুয়েনস এইরেসে ইসরায়েলি দূতাবাস এবং এএমআইএ ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ হামলায় ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন। আর্জেন্টিনার বিচারিক তদন্তে দীর্ঘদিন ধরেই এসব হামলার পেছনে ইরানি কর্মকর্তা ও হিজবুল্লাহর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই মিলেই সরকার ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আইজ্যাক অ্যাকর্ডস ঘোষণার সময়ও দুই দেশ বিশেষভাবে ‘পশ্চিম গোলার্ধে ইরানের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বিস্তার’ মোকাবিলার কথা জোর দিয়ে বলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা যত বাড়বে, আর্জেন্টিনা-ইসরায়েল সম্পর্ক তত বেশি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতাকেন্দিক হয়ে উঠবে।
আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের সমর্থকেরা বলছেন, এটি লাতিন আমেরিকাকে ইসরায়েলের আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষি উদ্ভাবন, পানি ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করবে।
তবে সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে লাতিন আমেরিকার অনেক দেশই ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করেছে; কেউ রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করেছে, আবার কেউ কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করেছে। এই বাস্তবতায় মিলেইর অবস্থান এই অঞ্চলের মূলধারার কূটনৈতিক প্রবণতার সম্পূর্ণ বিপরীত। সমালোচকদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা আর্জেন্টিনাকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে আরও প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে ফেলতে পারে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে।
আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে: ১. মিলেইর রাজনৈতিক অবস্থান: এই উদ্যোগটি অনেকাংশেই মিলেইর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। তাই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিনি কতটা শক্ত অবস্থানে থাকতে পারেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২. আঞ্চলিক দেশের অংশগ্রহণ: লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ এতে যোগ দেয় কি না, তা দেখার বিষয়। ইসরায়েল ইতিমধ্যে অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশকে এই জোটে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ৩. মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি: ইসরায়েল-ইরান দ্বন্দ্ব যদি আরও তীব্র হয়, তবে আইজ্যাক অ্যাকর্ডস কেবল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম না থেকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক-নিরাপত্তা জোটে পরিণত হতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন আর কেবল দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের রূপ নিচ্ছে, যার লক্ষ্য লাতিন আমেরিকায় ইসরায়েলের উপস্থিতি শক্তিশালী করা এবং ইরানের প্রভাব মোকাবিলা করা। আইজ্যাক অ্যাকর্ডস সেই প্রকল্পেরই সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। ভবিষ্যতে এটি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মতোই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে কি না, তা নির্ভর করবে এর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনীতির ওপর।
এমএস/