দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতের উত্তর প্রদেশে ঈদুল আজহার নামাজ ঘিরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। মসজিদের বাইরে নামাজ আদায়, সড়কে জামাত কিংবা খোলা স্থানে সমাবেশকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, নজরদারি ও সম্ভাব্য হয়রানির আশঙ্কায় অনেক মুসলিম পরিবার এবার ঈদের আগেই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের মিরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামের একটি ছোট মসজিদে ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠকে বসেন স্থানীয় মুসল্লিরা। তবে সেখানে কোরবানি বা উৎসবের আয়োজন নয়, আলোচনার মূল বিষয় ছিল— কোথায়, কীভাবে এবং কতজন মিলে ঈদের নামাজ আদায় করা হবে।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা মুসল্লিদের সতর্ক করে বলেন, মসজিদের ফটকের বাইরে ভিড় না করতে, উত্তেজনায় না জড়াতে এবং কোনো ধরনের ভিডিও ধারণ বা প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে চলতে।
মালিয়ানা গ্রামটি অতীতের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্যও পরিচিত। ১৯৮৭ সালে সেখানে হিন্দু জনতা ও প্রাদেশিক সশস্ত্র কনস্ট্যাবুলারির সদস্যদের হাতে ৭২ মুসলিম নিহত হন। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর ২০২৩ সালে প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের খালাস দেওয়া হয়।
স্থানীয় মুসলিমদের ভাষ্য, গত এক দশকে বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে খোলা স্থানে মুসলিমদের নামাজ আদায় নিয়ে বিরোধিতা বাড়তে থাকে। ডানপন্থি হিন্দু সংগঠনগুলো রাস্তা, পার্ক বা খালি জায়গায় নামাজকে ‘শক্তি প্রদর্শন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
সম্প্রতি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নামে একটি কট্টরপন্থি সংগঠন সারা দেশে সড়কে নামাজ নিষিদ্ধের দাবি জানায়। সংগঠনটি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
অন্যদিকে মুসলিমরা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে অনেক মসজিদ ও ঈদগাহে একসঙ্গে সব মুসল্লির জায়গা হয় না। ফলে ঈদের মতো বড় জামাতে অনেক সময় খোলা স্থানের প্রয়োজন হয়।
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সম্প্রতি মুসলিমদের ‘ধাপে ধাপে’ ঈদের নামাজ আদায়ের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে মানলে ভালো, না মানলে অন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এই বক্তব্যের পর মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অনেকেই দাবি করছেন, গত বছর খোলা স্থানে নামাজ আদায়ের অভিযোগে মামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং প্রশাসনিক হয়রানির ঘটনা ঘটেছে।
মিরাটের এক মুসলিম বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভীত। সামান্য ভুল করতেও ভয় পাচ্ছে।’
আলিগড়ের ব্যবসায়ী আরিফ মালিক জানান, গত ঈদে অল্প সময়ের জন্য খোলা মাঠে নামাজ আদায়ের পরও পুলিশ মুসল্লিদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ফলে এবার অনেক পরিবার মানুষকে ভিড় এড়িয়ে চলতে বলছে।
স্থানীয় মসজিদ কমিটিগুলোও এখন জামাত ছোট করা, দ্রুত মুসল্লিদের বের করে দেওয়া এবং সড়কে কেউ যেন দাঁড়াতে না পারে, সেসব নিয়ে পরিকল্পনা করছে।
মিরাটের মসজিদ কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘আগে ঈদের সকাল আনন্দের ছিল। এখন আগের রাত থেকেই দুশ্চিন্তা শুরু হয়— পুলিশ আসবে কি না, কেউ ভিডিও করবে কি না, তা নিয়েই সবাই ভাবছে।’
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নোমান খান বলেন, ‘মানুষ এখন শুধু শারীরিক নিরাপত্তা নয়, অপমানের ভয়ও পাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে টার্গেট হওয়া বা অভিযোগের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
শুধু উত্তর প্রদেশ নয়, দিল্লিসহ ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত আরও কয়েকটি রাজ্যেও একই ধরনের বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিমদের প্রকাশ্য ধর্মীয় চর্চা নিয়ে এই বিতর্ক ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী আজহার আহমদ খান বলেন, ‘এটি শুধু জনসমাগমের প্রশ্ন নয়, বরং কারা প্রকাশ্যে নিজেদের পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে পারবে— সেই প্রশ্নও।’
/অ