দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও শান্তি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ইসলামাবাদ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধকে স্থায়ীভাবে শেষ করার লক্ষ্যে আজ থেকে শুরু হচ্ছে এই বহুল প্রতীক্ষিত কূটনৈতিক বৈঠক।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল এবং ইরানের কূটনীতিকরা মুখোমুখি বসছেন এই আলোচনায়। মাত্র কয়েকদিন আগেও পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত না হলে ‘পুরো একটি সভ্যতাকে ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
তবে শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের কূটনৈতিক উদ্যোগে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়। আপাতত দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে এনে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী চুক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে এই প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন ইরান?
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদের আলোচনায় অংশ নেওয়া ইরান ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় আলোচনায় বসা ইরানের তুলনায় ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। তখন ইরান ছিল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্বল মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতায় চাপে। ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রকাশ করে।
কিন্তু গত ছয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার মুখেও ইরান তার পারমাণবিক অবকাঠামো ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করার সক্ষমতাও দেখিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
ইরান ইতোমধ্যে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, যাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার, পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণের দাবি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পরও তারা হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে পারেনি, যা তাদের বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এছাড়া অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সাফল্য দেখানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্র ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’ চায়, যা ইরান তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখে এবং আগেও প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইসরায়েলের অবস্থান
আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসরায়েলের অবস্থান। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতির পরই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি এবং প্রয়োজনে আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই ইসরায়েলি বাহিনী বৈরুতে শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়, যেখানে ২০০ জনের বেশি নিহত হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাম্পকে সরাসরি নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা নিজস্ব স্বার্থে আলোচনা করছে, নাকি ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কারণ দুই পক্ষের লক্ষ্য এখন স্পষ্টভাবে ভিন্ন।
অনিশ্চিত সমাধানের পথ
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা খুবই সীমিত পরিসরে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া ও একটি রাজনৈতিক সাফল্য চায়, আর ইসরায়েল চায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার স্থায়ী অবসান।
তবে কূটনৈতিকভাবে এখনো একটি সমাধানের পথ খোলা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রস্তাবিত কাঠামোর মধ্যে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারে।
ইসলামাবাদের এই আলোচনা নতুন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের মধ্যে কূটনীতির প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আলোচনা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কতটা বাস্তবতা মেনে আপস করতে পারে তার ওপর।
তথ্যসূত্র: দ্য ডন
/অ