দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে, সেই মহুর্তে ইসরায়েল অস্বাভাবিকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
চলতি মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানানো ছাড়া, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার সবচেয়ে বড় শত্রুর বিরুদ্ধে মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন কিছু বলেননি। তার সরকারও একইভাবে নীরব থেকেছে।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজে ইরানবিষয়ক সিনিয়র গবেষক এবং ২৫ বছর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করা ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, ‘এ নীরব থাকা বুঝায় নেতানিয়াহু এ মুহূর্তটাকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।’
‘যুক্তরাষ্ট্র যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে এত বিপুল সেনা মোতায়েন করেছে এবং ট্রাম্প যখন ইরানে হামলার এত কাছাকাছি, তখন এটি নেতানিয়াহুর কাছে এক স্বর্ণালি সুযোগ—যা তিনি হাতছাড়া করতে পারেন না,’ বলেন সিত্রিনোভিচ।
ইসরায়েলের সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সাবেক উপপরিচালক আসাফ কোহেনের মতে, ইসরায়েলের এই নীরবতার মধ্যেও রয়েছে কৌশল।
‘ইসরায়েলি নেতারা মনে করে, ইসরায়েল চায় এবার যুক্তরাষ্ট্রই নেতৃত্ব দিক। তার কথায়, যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী, সামরিক সক্ষমতা বেশি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও অনেক বেশি। তাই ইসরায়েল ইচ্ছা করেই নীরব রয়েছে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ইসরায়েলের জন্য প্রধান হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে দেখে আসছেন। তার প্রকাশ্য নীরবতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন আলোচনার অভাব নির্দেশ করে না।
এই সপ্তাহে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান শ্লোমি বিন্ডার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের মতে, আলোচনায় ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়ে কথা হয়েছে।
নেতানিয়াহু নাকি জানুয়ারির শুরুতে ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সীমিত রাখতে অনুরোধ করেছিলেন। তবে ড্যানি সিত্রিনোভিচ মনে করেন, নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে নয়, গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন বড় আকারের সামরিক হামলার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যার লক্ষ্য হবে ইরানে শুধু আঘাত হানা নয়—বরং পুরো শাসনব্যবস্থাই পরিবর্তন করা
তার মতে, নেতানিয়াহু হামলা থামাতে বলেছিলেন কারণ পরিকল্পিত মার্কিন হামলাটি তার চোখে ‘খুবই ছোট’ ছিল।
গত বছর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু ইরানিদের তাদের সরকারের বিরুদ্ধে ‘দাঁড়িয়ে যেতে’ আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছেন—যার মধ্যে সীমিত প্রতীকী হামলা থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। প্রকাশ্যে তিনি কখনো সামরিক হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনো নতুন আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছেন।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র সতর্ক করে দিচ্ছে, ইরানের নেতৃত্ব উৎখাত করার চেষ্টা অঞ্চলটির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, ইসরায়েলে অনেকেই এতে নিজেদের নিরাপত্তার সম্ভাব্য লাভ দেখছেন।
তেহরানে সরকার পরিবর্তন হলে ইসরায়েল আশা করে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি এবং ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সম্ভাবনা শেষ হবে।
এতে অঞ্চলজুড়ে ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়াগুলিও আরও দুর্বল হবে, যার মধ্যে লেবাননে সীমান্তের ওপারে থাকা হিজবুল্লাহও রয়েছে—যাদের কাছে এখনও ইসরায়েলের আলমা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে প্রায় ২৫ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট রয়েছে।
এর বিপরীতে, কিছু ইসরায়েলি আইনপ্রণেতা মনে করেন সীমিত হামলা বা এমনকি নতুন কোনো চুক্তিও ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ এতে বর্তমান শাসনব্যবস্থাই টিকে থাকবে।
‘আপনি যখন সম্পূর্ণ অশুভ শক্তির সঙ্গে মোকাবিলা করেন, তখন সীমিতভাবে কাজ করেন না,’ বলেন ইসরায়েলের পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির সদস্য ও ইয়েশ আতিদ বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মোশে তুর-পাজ।
‘একটি ঐকমত্য আছে যে, ইসরায়েলকে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে এবং পশ্চিমা বিশ্বকেও তাই করতে হবে। ইরানের মতো আমাদের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রুদের ক্ষেত্রে বড় কোনো মতপার্থক্য নেই। আমরা সবাই হুমকিটা বুঝি।’
অনেকের মতে, আরেক দফা সংঘাত যার শেষে শাসনব্যবস্থা অক্ষত থাকে, তা ইরানের পাল্টা হামলায় যে মূল্য দিতে হবে, তার তুলনায় মোটেও সার্থক হবে না।
গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে, যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, তখন ইরান শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইসরায়েলের শহরগুলোর দিকে। এর কিছু ইসরায়েলের বিখ্যাত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে তেল আবিবের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে আঘাত হানে এবং অন্তত ২৮ জন নিহত হন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও বেশি হতাহতের জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু এখন তেহরানের বেড়ে ওঠা নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সেই সংঘাত থেকে ইরান শিক্ষা নিয়েছে এবং যুদ্ধ চলাকালে তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। ছয় মাস পর, ইরান আবার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে।
গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সামাজিক মাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো হামলা চালায়, তবে তেল আবিবে ‘তাৎক্ষণিক ও নজিরবিহীন’ জবাব দেওয়া হবে।
‘নেতানিয়াহু ভয় পাচ্ছেন ইসরায়েল আবারও হামলার যন্ত্রণা ভোগ করবে, কিন্তু শাসন পরিবর্তন হবে না,’ বলেন সিত্রিনোভিচ। ‘তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ বন্ধ করতে হলে সরকার পরিবর্তন দরকার, আর তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমেই সম্ভব।’
ইরানি শাসনব্যবস্থার এই তীব্র দুর্বলতার মুহূর্ত—১২ দিনের যুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত, আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনী দুর্বল, এবং দেশের ভেতরে ব্যাপক বিক্ষোভ—এটিও একটি সুযোগ বলে মনে করেন কোহেন।
‘ইরান এখন তার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়—এটি এমন একটি সুযোগ যা আর নাও আসতে পারে,’ বলেন কোহেন। ‘অনেকে মনে করেন, এটাই সময়—এখন নয় তো কখনোই না।’
তেল আবিবে, গত জুনে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বসবাসরত মানুষজন নতুন আরেকটি সংঘাত নিয়ে আলোচনা করছেন।
‘আমি আশা করি আমাদের নেতারা এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না,’ বলেন ২০ বছরের এক তরুণ, নেরিয়া।
“হামলা হোক বা অন্য কোনো উপায়ে—আমি জানি না। কিন্তু অবশ্যই আমাদের এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সরকার পরিবর্তনের দিকে যেতে হবে। বোমার সঙ্গে আমাদের আগে থেকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে—ভালো লাগে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যদি এতে আমরা আরও নিরাপদ বোধ করি, তবে সেটার মধ্য দিয়েই যেতে হবে।’
কাছেই থাকা এক তরুণী, শানি, বলেন তার অনুভূতি মিশ্র, ‘আমি জানি অনেক ইরানি মানুষ চান যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাহায্য করুক। আমি শুধু আশা করি সবাই নিরাপদ থাকবে,’ তিনি বলেন। ‘রাজনীতিবিদদের মানুষের কথা ভাবা উচিত। প্রতিটি পদক্ষেপের পরিণতি আছে।’
ইসরায়েলের জরিপগুলো বারবার দেখাচ্ছে, দেশটির ইহুদি জনগোষ্ঠীর বড় অংশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করে—এমনকি গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পরও।
তবে সরকার পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকেই যায়। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ঘিরে সামরিক ও ধর্মীয় জোটে এখনো বড় কোনো ফাটল দেখা যাচ্ছে না, এবং দেশের বিরোধী আন্দোলনও বিভক্ত। ফলে সরকার পতন হলে কে ইরানের নিয়ন্ত্রণ নেবে, তা স্পষ্ট নয়।
একই শাসকগোষ্ঠীর কোনো তরুণ উত্তরসূরি ইসরায়েলের প্রতি আরও নমনীয় হবেন—এমন নিশ্চয়তাও নেই। আর গৃহযুদ্ধের বিশৃঙ্খলা শুধু ইরানের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই মারাত্মকভাবে অস্থিতিশীল হবে।
এ ছাড়া অনেক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকই উল্লেখ করেছেন, কেবল বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দিয়ে সাধারণত কোনো শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা যায় না।
এই বছর নির্বাচনের মুখোমুখি হয়ে, হামাসের হামলার পর ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে নিজের ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে নেতানিয়াহু কঠোর পরিশ্রম করছেন। ইরানে সরকার পরিবর্তন—অথবা খামেনির হত্যাকাণ্ড—একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন হতে পারে, তবে সেটি ঝুঁকিও বটে।
সিত্রিনোভিচের মতে, ‘এটি এক ধরনের হিসাব করা জুয়া। নেতানিয়াহু পরদিন কী হবে, তা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। তার লক্ষ্য—ট্রাম্পের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দেখানো যে তিনি ইরানি সরকার ধ্বংস করেছেন। যদি নিশ্চিত হন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি যাবে, তবে এই ঝুঁকি নিতে তিনি প্রস্তুত।’
তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর, আর এটাই ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
এবি/