দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে বেজে চলেছে দুঃখের গান। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি পেঙ্গুইনের দল খাবারের খোঁজে বরফের চাদরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে। যেতে যেতে হঠাৎই, দলের মধ্যে থাকা ১টি পেঙ্গুইন তার বন্ধুবান্ধব ও পরিবারকে বিদায় জানিয়ে উল্টো পথে হাঁটা শুরু করল। দল ছেড়ে সে একাই এগিয়ে চলেছে দুর্গম পথে। ব্যাপারটা আসলে কী?
পৃথিবীর একদম দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ। দূরদূরান্ত পর্যন্ত বরফ। তুষারঝড় থেকে শুরু করে শৈত্যপ্রবাহ, এই সাদা বরফে ঢাকা মহাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এখানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা থাকে -২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্য দিকে শীতকাল হয় ভয়ঙ্কর। সেই সময়ে তাপমাত্রা নেমে যায় -৬০ থেকে – ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও। আর এই মহাদেশ জুড়ে রাজত্ব করে পেঙ্গুইনরা।
পাহাড়ে যাওয়ার জন্য তাকে অতিক্রম করতে হবে ৭০-৮০ কিলোমিটার বরফের পথ। যাওয়ার সময়েই পানি, খাবার না পেয়ে এবং তীব্র ঠাণ্ডার কারণে পেঙ্গুইনের মৃত্যু হতে পারে। সেই কথা জানা সত্ত্বেও এই ছোট্ট পেঙ্গুইন কেন যাচ্ছে আলাদা পথে?
এ নিয়ে ২০০৭ সালে একটি জনপ্রিয় তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন জার্মান চলচ্চিত্র পরিচালক ওয়ের্নার হার্জগ। যার নাম ছিল ‘এনকাউন্টার অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। এই তথ্যচিত্রটি করার সময়ে ক্যামেরাবন্দি হয় পেঙ্গুইনের সেই ভিডিও। ১৯ বছর পরে সেই ভিডিও এ বার ভাইরাল হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই পেঙ্গুইনকে ডাকা হচ্ছে ‘নিহিলিস্ট পেঙ্গুইন’ নামে।
২০০৭ সালে যে দিন ওয়ের্নার হার্জগ পেঙ্গুইনের এই বিরল দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছিলেন, সেই সময়ে অ্যান্টার্কটিকা পেঙ্গুইনের গতিবিধি দেখার জন্য একটি বিজ্ঞানীদের দলও উপস্থিত ছিল। তারা সকলেই মনে করেন, ওই একটি পেঙ্গুইন হয়তো নিজের পথ ভুলে গিয়েছে। যে কারণে বিজ্ঞানীদের দল সেই পেঙ্গুইনকে ধরে তার দলের কাছে ছেড়ে দেয়।
মজার বিষয় হলো, পেঙ্গুইনটি পুনরায় তার দল থেকে বিচ্যুত হয়ে দূরের সাদা বরফের পাহাড়ের দিকে দৌড় দেয়। সেই সময়ে ওয়ের্নার হার্জগ বিজ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করেন, এই পেঙ্গুইনের কী হয়েছে? বিজ্ঞান বলছে, এই ‘একাকিত্ব’ আসলে টিকে থাকারই এক কৌশল। তবে তাহলে কেন এমন হয়?
অসুস্থতা ও দুর্বলতা
পেঙ্গুইনরা সূর্যের আলো ও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে দিক নির্ণয় করতে পারে। হাজার হাজার পেঙ্গুইনের ভিড়ে শক্তিশালী আর দুর্বলদের পার্থক্য স্পষ্ট। অসুস্থ বা আহত পেঙ্গুইনরা অনেক সময় ধীরে চলতে পারে না, ফলে তারা ঠিকভাবে দিক নির্ণয় করতে পারে না। খাবার খোঁজার সময় বা ঝড়ের মধ্যে তারা পিছিয়ে পড়ে—এভাবেই আলাদা হয়ে যায়।
ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
মাথায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটলেও, পেঙ্গুইন দিক নির্ণয়ে ভুল করতে পারে। যার ফলে ওই ছোট্ট পেঙ্গুইন ভাবছে, সে ঠিক পথেই হেঁটে চলেছে। তাই তাকে ফিরিয়ে দলের মধ্যে নিয়ে আসার পরেও, সে পুনরায় উল্টো পথে হাঁটা শুরু করে।
পালক বদলের সময়
বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পেঙ্গুইনরা পুরোনো পালক ঝরিয়ে নতুন পালক গজায়। এই সময়ে তারা সমুদ্রে নামতে পারে না—মানে খাবারও জোটে না। নিরাপদ, অপেক্ষাকৃত নির্জন জায়গায় গিয়ে তারা আলাদা থাকে। এটাও ইচ্ছাকৃত বিচ্ছিন্নতা।
ছানার হারিয়ে যাওয়া
তুষারঝড়, শিকারির আক্রমণ বা মানুষের উপস্থিতির মতো বিঘ্নে কখনও ছানা মা–বাবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ডাকাডাকিতে মিল খোঁজে, কিন্তু ভিড়ে হারিয়ে গেলে আলাদা হয়ে পড়াই বাস্তবতা।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়
হঠাৎ ব্লিজার্ড, বরফ ভাঙন বা সমুদ্রের বরফ সরে যাওয়া—এগুলো কলোনিকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে। তখন কিছু পেঙ্গুইন ভৌগোলিকভাবেই আলাদা হয়ে পড়ে।
খাবারের খোঁজে দূরে যাওয়া
সব পেঙ্গুইন একসঙ্গে খাবার পায় না। মাছ বা ক্রিলের অবস্থান বদলালে কেউ কেউ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। ফিরে আসার সময় দল খুঁজে না পেলে তারা সাময়িকভাবে একা হয়ে যায়।
একাকিত্ব
ওয়ের্নার হার্জগের মতে, অনেক সময়ে মানুষদের যেমন একাকিত্ব অনুভব হয়, ঠিক সেই ভাবে পেঙ্গুইনদেরও হতে পারে। যে কারণে এই পেঙ্গুইন তার দল ছেড়ে চলে যায় অন্য পথে।
একা মানেই দুর্বল?
সব সময় নয়। কিছু ক্ষেত্রে আলাদা থাকা মানে ঝুঁকি কমানো—রোগ ছড়ানো ঠেকানো, পালক বদলের নিরাপত্তা, বা শক্তি সঞ্চয়। তবে দীর্ঘদিন একা থাকলে ঠাণ্ডা, শিকারি আর অনাহারের ঝুঁকি বেড়ে যায়—তাই কলোনিই তাদের সবচেয়ে বড় ঢাল।
পেঙ্গুইনদের একাকিত্ব আমাদের চোখে বেদনাদায়ক লাগলেও, প্রকৃতির হিসেব আলাদা। কখনও বাধ্যতামূলক, কখনও কৌশল—এই আলাদা হয়ে যাওয়া আসলে বেঁচে থাকারই আরেক নাম।
এবি/