দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

‘বড় পরিসরে’ হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে গেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। স্থানীয় সময় শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে চালানো অভিযানে তাদের বন্দি করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ডেল্টা ফোর্স।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ, তার ভেনেজুয়েলীয় সমকক্ষ মাদক পাচার ও অপরাধের মাধ্যমে আমেরিকায় অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছেন। এছাড়া মাদুরো অবৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বলেও দাবি যুক্তরাষ্ট্রের।
তবে ভেনেজুয়েলা সরকার বলছে, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ—যার মধ্যে নিষিদ্ধ তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ করাও রয়েছে—প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেশের তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার অংশ।
এদিকে স্ত্রীসহ আটকের পর বিশ্বজুড়ে আলোচনায় নিকোলাস মাদুরো। সবার প্রশ্ন কে এই মাদুরো?
নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সাবেক বামপন্থী প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর তিনি দেশটির ক্ষমতায় আসেন।
জানা যায়, ভেনেজুয়েলার অবিসংবাদিত মহান নেতা ও দেশটির প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন নিকোলাস মাদুরো। শাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে মাদুরো ভেনেজুয়েলার বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ধাপে ধাপে উঠে আসেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি একজন বাসচালক ও শ্রমিক ইউনিয়নের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। শাভেজের শাসনামলে মাদুরো প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নিকোলাস মাদুরোর জন্ম ১৯৬২ সালে রাজধানী শহর কারাকাসে। বাবা কমিউনিস্ট নেতা হওয়ার সুবাদে বামপন্থী রাজনীতি মিশে ছিল মাদুরোর রক্তে। পরিবারে কমিউনিস্ট চর্চা চালু থাকায় তার রাজনীতির হাতেখড়ি হয় বাড়িতেই। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট মাদুরো জীবিকার তাগিদে বেশ কয়েক বছর কারাকাস মেট্রো সিস্টেমে বাস ড্রাইভারের চাকরি করেন।
একপর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করেন তিনি। সেখান থেকেই মূলত রাজনীতির শুরু মাদুরোর। এক পর্যায়ে কোম্পানি ট্রেড ইউনিয়ন বন্ধ করে দেয়। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হোসে ভিনসেন্তে র্যাঞ্জেলের দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
তবে মাদুরো মূলধারার রাজনীতিতে আসেন ১৯৯০ সালে হুগো শ্যাভেজের সামরিক আন্দোলনে যোগ দিয়ে। সেই আন্দোলনের বেসামরিক শাখা এমবিআর-২০০’র সদস্য হন মাদুরো। ১৯৯২ সালে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় কারাদণ্ড হয় শ্যাভেজের।
১৯৯৪ সালে শ্যাভেজের মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়ে লাইমলাইটে আসেন নিকোলাস মাদুরো। ওই বছর মুক্তি পান শ্যাভেজ এবং ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন তিনি। সেই সময় প্রথমবারের মতো ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য হন মাদুরো। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালে তিনি ভেনেজুয়েলার সংবিধান প্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০০০ সালে আইন বিভাগের প্রধান হিসেবে মনোনীত হন মাদুরো।
২০০৬ সালে ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচিত হন মাদুরো। আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের কড়া সমালোচক ছিলেন হুগো শ্যাভেজ। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আমেরিকার তৎকালিন প্রেসিডেন্ট বুশকে ‘খুনি’ এবং ‘রক্ত পিপাসু’ বলে অভিহিত করেছিলেন শ্যাভেজ। সেই একই আদর্শ এবং মানসিকতার অনুসারী নিকোলাস মাদুরো। ২০০৭ সালে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তৎকালীন আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইসকে ‘হিটলার’ এবং ‘ভণ্ড’ বলে উল্লেখ করেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাদুরো নিজেকে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তিনি বারবার ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে তার সরকারকে অস্থিতিশীল করতে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা, অর্থনৈতিক নাশকতা ও নিষেধাজ্ঞা সমর্থনের অভিযোগ করে আসছেন।
অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলো এবং ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো মাদুরোর বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে—যা তিনি অস্বীকার করে আসছেন।
২০১৩ সালে নিকোলাস মাদুরো নির্বাচন করে অল্প ভোটের ব্যবধানে প্রথম মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হন। ২০১৮ সালের ২০ মে পুনরায় নির্বাচিত হন। বিতর্কিত ও কারচুপির অভিযোগ এনে সেই নির্বাচন বর্জন করেছিল দেশটির বিরোধী দল। মাত্র ৪৬ শতাংশ কাস্টিং ভোটের মধ্যে ৬৭.৭% ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মাদুরো, অপরদিকে বিরোধী দলীয় নেতা হেনরি ফ্যালকন পান ২১.২ শতাংশ ভোট।
ক্ষমতা নেওয়ার পরই তার বিরুদ্ধে গণতন্ত্র নস্যাৎ করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর বিভিন্ন অভিযোগ আসে। নিকোলাস মাদুরো বিরোধী মত সহ্য করেন না এবং তার কারণে সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ রযেছে।
২০২৪ সালে টানা তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মাদুরো। তিনি দাবি করেছিলেন, নির্বাচনে ৫২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তবে বিরোধী দল মাদুরোর বিজয়ের ঘোষণাকে জালিয়াতি বলে আখ্যা দেয়। তারা দাবি করে, বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেস অন্তত ৭৩ দশমিক দুই শতাংশ ভোট পেয়ে নিশ্চিতভাবে বিজয়ী হয়েছেন। সেই নির্বাচনে মাদুরোর বিজয়কে যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ দেশ স্বীকৃতি দেয়নি।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতা নেওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব চরমে উঠে। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের চেষ্টার কথা স্বীকার না করলেও মাদুরোকে অবৈধ তকমা দিয়ে মাদক পাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে আসছিল। মাদুরোর ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলবাহী জাহাজ জব্দসহ বিভিন্ন আর্থিক কৌশল অবলম্বন করছে।
সর্বশেষ আজ শনিবার মধ্যরাতে জধানী কারাকাসসহ দেশটির বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালায় মার্কিন বিমান বাহিনী। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ডেল্টা ফোর্স মাদুরো ও তার স্ত্রীকে দেশটি থেকে তুলে নিয়ে গেছে বলে জানান মার্কিন কর্মকর্তারা।
এবি/