দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনা প্রত্যাহারের আহ্বানকে সমর্থন দিয়েছে রিয়াদ। মঙ্গলবার এই সতর্কবার্তা আসে, দক্ষিণ ইয়েমেনের বন্দর নগরী মুকাল্লায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার কিছুক্ষণ পর।
এই বক্তব্যকে এখন পর্যন্ত আবুধাবির বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সবচেয়ে কঠোর অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত দক্ষিণ ইয়েমেনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিদেশি সামরিক সহায়তার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি আমিরাতি বাহিনীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেন ছাড়ার সময়সীমা বেঁধে দেন। সৌদি আরব প্রকাশ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এই নির্দেশ মানার আহ্বান জানায়।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দু’দেশই ওপেকভুক্ত বড় তেল উৎপাদক দেশ। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে এই টানাপোড়েন তেল উৎপাদন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ঐকমত্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ওপেকের ভার্চুয়াল বৈঠক আগামী রোববার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে করা একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করেছেন। টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বা এসটিসিকে সমর্থনের মাধ্যমে ইয়েমেনে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনেন আমিরাতের বিরুদ্ধে। আল-আলিমি বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে এটা এখন স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে সংযুক্ত আরব আমিরাত এসটিসিকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল করতে এবং সামরিক উত্তেজনার মাধ্যমে বিদ্রোহে উৎসাহ দিয়েছে।’ এ বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাজারেও। মঙ্গলবার গালফ অঞ্চলের প্রধান শেয়ার সূচকগুলো নিম্নমুখী ছিল।
২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে সংযুক্ত আরব আমিরাত সক্রিয় ছিল। ২০১৯ সালে তারা ইয়েমেন থেকে সেনা কমানো শুরু করলেও সৌদি সমর্থিত আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারের প্রতি সমর্থন বজায় রাখে। পরে দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল দক্ষিণ ইয়েমেনে স্বশাসনের দাবি তোলে। চলতি মাসে তারা সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে আকস্মিক সামরিক অভিযানে অগ্রসর হয়। এতে ইয়েমেনে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতের আশঙ্কা বেড়ে যায় এবং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ নতুন করে জ্বলে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই অভিযানে বহুদিনের অচলাবস্থা ভেঙে যায়। এসটিসি দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ ইয়েমেনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, যার মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাদরামাউত প্রদেশও রয়েছে। সৌদি আরব এর আগে হাদরামাউতে সামরিক তৎপরতা না চালাতে সতর্ক করেছিল এবং এসটিসিকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছিল। তবে এসটিসি সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, শনিবার ও রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে অনুমতি ছাড়াই দুটি জাহাজ মুকাল্লায় পৌঁছায়। জাহাজ দুটি বন্দরে পৌঁছে নিজেদের ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে দেয় এবং এসটিসিকে সহায়তার জন্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও যুদ্ধযান খালাস করে। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে ‘গ্রিনল্যান্ড’ নামের একটি জাহাজ থেকে অস্ত্র ও যুদ্ধযান নামানো হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। সংস্থাটি জানায়, জাহাজটি ফুজাইরা বন্দর থেকে এসেছিল।
সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়েছে, মুকাল্লা বন্দরে চালানো বিমান হামলায় কোনো হতাহত বা পার্শ্বক্ষতি হয়নি। তবে রয়টার্সকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, হামলাটি সেই ডকের ওপর চালানো হয়, যেখানে জাহাজ দুটির মালামাল খালাস করা হয়েছিল। কী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বা কী ধরনের পণ্য ছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে হামলার পর ভোরের দিকে বন্দরের ওপর কালো ধোঁয়া উঠতে এবং পুড়ে যাওয়া যানবাহন দেখা যায়।
এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রধান আল-আলিমি ৭২ ঘণ্টার জন্য সব বন্দর ও সীমান্তপথে আকাশপথ, স্থলপথ ও নৌপথ অবরোধ ঘোষণা করেছেন। তবে জোটের অনুমোদিত ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞার ব্যতিক্রম থাকবে।
হাদরামাউত প্রদেশ সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এবং অঞ্চলটির সঙ্গে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। অনেক প্রভাবশালী সৌদি নাগরিকের শিকড় এই অঞ্চলে।
এদিকে প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের উপপ্রধান ও এসটিসি প্রধান আইদারুস আল-জুবাইদি কাউন্সিলের আরও তিন সদস্যের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে বলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ওই বিবৃতিতে আল-আলিমির নির্দেশনা প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়, এসব সিদ্ধান্তে ঐকমত্য নেই। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছি, নেতৃত্ব পরিষদের ভেতরে বা বাইরে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আরব জোট থেকে কোনো দেশকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এটি আঞ্চলিক কাঠামো, জোট ও আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়, যা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা খেয়ালের ওপর নির্ভর করে না।’
২০২২ সাল থেকে সৌদি সমর্থিত ক্ষমতা ভাগাভাগির উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসটিসি এমন এক জোটে রয়েছে, যা হুথি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা দক্ষিণ ইয়েমেনের অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে হুথিরা রাজধানী সানাসহ উত্তর ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং সৌদি সমর্থিত সরকারকে দক্ষিণে পালাতে বাধ্য করেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আরও জানায়, বৈধ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো দেশ যেন কোনো ইয়েমেনি পক্ষকে সামরিক সহায়তা দিতে না পারে, তা তারা নিশ্চিত করতে থাকবে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/